স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে পৃথিবী

103
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
Content Protection by DMCA.com

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী
স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে পৃথিবী

মানব ইতিহাসে অনেক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, কিছু যুদ্ধ ছিল অঞ্চল দখল করা নিয়ে, কিছু যুদ্ধ গোত্রীয় বা কিছু বাণিজ্যিক! কিন্তু এমনও যুদ্ধ আছে বিশ্ব ইতিহাসে যেটি সংগঠিত হয়েছিল আদর্শ নীতি, উদ্ভাবন, সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে- সেটি হলো স্নায়ুযুদ্ধ। ঠিক, যুদ্ধ না হয়েও যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবে থমথমে হয়ে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় হতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত।

এরপর, মার্কিনিদের কুটনীতির কাছে হেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন খন্ডিত হবার পরেই থামে এ বিশ্ব অস্থিরতা! পূর্ব ইউরোপ ছিন্নভিন্ন করার পরে এবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনোনিবেশ করে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে! কারন, প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানোর জন্যে তাদের একটা না একটা প্রতিপক্ষ লাগবে যাকে লক্ষ্য করে তারা প্রক্সিযুদ্ধে জড়িয়ে পারমানবিক শক্তির পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে পারবে। যে যুদ্ধগুলোর মাধ্যমে বিশ্বে ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করে একমেরুকেন্দ্রীক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

স্নায়ুযুদ্ধ পৃথিবীকে চিরতরে বদলে দেয়৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মিত্রশক্তির দেশগুলো ইয়াল্টা কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করে। এ কনফারেন্সের উদ্দেশ্য ছিল জার্মানিকে চার ভাগে ভাগ করা। এ বিভক্তিকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অভিসন্ধি থাকলেও, রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের উভয়ের লক্ষ্য ছিল প্রাচ্যে কর্তৃত্ব স্থাপন করা।

মূলত, এই অঞ্চল নিয়ে দরকষাকষি নিয়েই এই দুই পরাশক্তি স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া একদিকে এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে মুক্তবাণিজ্য স্থাপনে ব্যস্ত। দু দেশই একই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা নিয়ে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে।

স্নায়ুযুদ্ধ ছিল অস্থিরতার বিশৃঙ্খলার সময়। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লেও অনেক গুলো প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধগুলোকে প্রক্সি বলা হয় কারন, এসব যুদ্ধে দু পক্ষ হয়ে মার্কিনিরা আর সোভিয়েতরা অর্থায়ন করত, অস্ত্র রপ্তানি করত, মদদ জুগিয়ে সাহায্য করত।

এমনি শুরুর দিকের যুদ্ধ ছিল কোরীয় যুদ্ধ যার এখনো কোনো সমাধান মিলে নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, এমনকি আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রক্সি যুদ্ধে জড়িত ছিল।

এছাড়াও, আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ তৈরি হবার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যাকে এখন ‘কিউবার মিসাইল সংকট’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তীর ঘেঁষে তুরস্কে সেনাঘাটি স্থাপন করলে, রাশিয়াও কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র মিসাইল স্থাপনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এবং, তৈরি হয় এক ভয়ংকর পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতি পৃথিবী সামাল দিলেও, থেমে থাকে নি নানান ভয়ংকর পারমাণবিক পরীক্ষা নিরিক্ষা।

রাশিয়া তৈরি করে ‘হাইড্রোজেন’ বোম্ব। যা হিরোশিমা -নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত হওয়া ফ্যাট বোম্ব আর লিটল বোম্বের তুলনায় হাজার গুন বেশি শক্তিশালী। আমেরিকাও কম যায় নি, সমানতালে চালিয়ে যেতে থাকে বিভিন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা।

গোয়েন্দা তৎপরতাও বেড়ে গিয়েছিল বহুলাংশে। রাশিয়ার ‘কেজিবি’ আর আমেরিকার ‘সি আই এ’ হয়ে যায় পরস্পরের অঘোষিত শত্রু। তারা, বিভিন্ন গুপ্ত অভিযানে লিপ্ত ছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দুই সামরিক জোট। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাটো’ আর রাশিয়ার ‘ওয়ার্শ প্যাক্ট’। মুলত, পুরো বিশ্বই তখন মগ্ন ছিল এই উন্মত্ত খেলায়।স্নায়ুযুদ্ধ চিকিৎসা হতে শুরু করে উদ্ভাবনে, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করে।

এ যুদ্ধের সুফলের মধ্যে ছিল,মানুষের মহাকাশ জয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বপ্রথম মহাকাশে মনুষ্যবাহী যান পাঠালে,আমেরিকাও পাল্লা দিয়ে চন্দ্রাভিযান চালায়। এসময়, পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়ে মহাকাশে সেটেলাইট প্রেরিত হয়। আজ এই সেটেলাইটের মাধ্যমেই বিশ্বে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে এবং সেই সাথে চলছে নজরদারি! বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধিত হয়।

দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার জের ধরে তৈরি হয় ইন্টারনেট, সুপার কম্পিউটার, জেট বিমানসহ নানান আধুনিক প্রযুক্তি। চিকিৎসাক্ষেত্রেও আবিষ্কার হয় নানান প্রতিষেধক আর টেস্টটিউব বেবি, আইএমএফ, ক্লোনিং সহ নানান প্রযুক্তির। মোট কথা, স্নায়ুযুদ্ধের সময় মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাটালেও, এসময়টা গোটা পৃথিবীকে নতুন রূপে ঢেলে সাজিয়েছিল।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গুলো পালটে গিয়েছিল। লিবারেলিজম আর নিওলিবারেলিজমের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক নতুন নতুন স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছিল। তবে, স্নায়ুযুদ্ধ হবার জন্য দায়ী মনে করা হয় মতানৈক্যকে! সাম্যবাদের লাল জুজুকে হটানোর জন্যে বদ্ধপরিকর ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানকে বলা হয় এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রধান কারিগর। ১৯৪৭ সালে মার্কিন কংগ্রসের এক অধিবেশনে বার্ণাড বালুচ নামে রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা সর্বপ্রথম কোল্ডওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের কথা বলেন। সেসময়, হতেই মার্কিনিরা সচেষ্ট হয় ১৯১৭ সালে ঘটে যাওয়া রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে সমগ্র দক্ষিন-পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া কমিউনিজমের বিস্তার থামাতে।

বিশেষ করে ১৯৪৯ সালে ঘটে যাওয়া চীন বিপ্লবের ফলে, এই কমিউনিজমের ধারা মার্কিনিদের বিশেষ মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য, তারা পশ্চিম ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে অর্থায়ন ও সহায়তা করতে থাকে, যেন এসব অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় আর পশ্চিম ইউরোপকে সঙ্গে নিয়ে যেন একটি সঙ্ঘবদ্ধ পুঁজিবাদী জোট গড়ে তুলতে পারে।

এভাবেই, রুখে দেওয়া যেতে পারে সাম্যবাদের অগ্রযাত্রা। চীনা বিপ্লবের বছরেই, ১৯৪৯ সালে সেই লক্ষ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি শিল্পোন্নত পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো নিয়ে গঠিত হয়, ‘ন্যাটো’ বা উত্তর আটলান্টিক সংস্থা। শুধু ইউরোপে নয়,লাতিন ও মধ্য আমেরিকাতেই কমিউনিজম ঠেকাতে আমেরিকা তৎপরতা চালায়।

আর ঠিক এই কারনে, ১৯৬৫ সালে কিউবার বিপ্লবের পর, কখনও ডোমিনিকান রিপ্লাবলিকে অথবা চিলিতে অপছন্দনীয় বা কমিউনিস্ট পন্থী সরকারকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করেও, পেছন হতে সেদেশগুলোর প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে অর্থায়ন করে ও মদদ জুগিয়ে, সরকার হঠাও আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের জন্যে লেলিয়ে দিয়ে অথবা প্রেসিডেন্টের গুপ্তহত্যার মাধ্যমে বামপন্থী সরকারের পতন ঘটায়।

১৯৫৫ সালে ন্যাটো পরিপন্থী ‘ওয়ারশ চুক্তি’ গড়ে তুলে রাশিয়া পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে নিয়ে। ১৯৬৫ সালে হাঙ্গেরি ও ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভেকিয়ায় ওয়ারশের মদদে প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নতুন গঠিত জোটকে ভেস্তে দেওয়া হয়।

এভাবে, ইউরোপের দেশগুলোকে কেন্দ্র করে ঠান্ডা যুদ্ধ চলমান থাকে আর দুদেশের রেষারেষি, মনোমালিন্যের জন্য পরস্পরের দুরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার রাজনৈতিক অসন্তোষ আর জনরোষের আক্রোশে পড়ে, মিখাইল গর্ভাচেভ পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত নীতি নামক যে দুটি সংস্কার পদ্ধতি গ্রহন করেন তাতেই নিহিত থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের ধ্বনি।

১৯৮৯ সালে ওয়ার্শ ভুক্ত দেশগুলির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একত্রিত হয়ে কনফারেন্সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, এ দেশগুলি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুক্ত হয়ে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পূর্ণমিলন ঘটে।

এরপরপরই, ১৯৯১ সালের ২১ শে নভেম্বর, ওয়্যারসভুক্ত ৩৪টি দেশ, প্যারিশ সম্মেলন ঘোষণা করে এবং ইউরোপের দীর্ঘ ৪৫ বছরের এই অঘোষিত সংকট হতে উত্তরণের ব্যবস্থা করে, যার ফলে সেবছর এপ্রিলে ওয়ার্শ জোটের ও ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির মাধ্যমে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান হয়।

এই ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পরই বিশ্বে দ্বিমেরুর রাজনীতি থেকে সরে এসে একমেরুকেন্দ্রীক রাজনীতির সূচনা হয়, যেখানে আমেরিকা হয়ে উঠে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এরপরের আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে সকল সংকট হয় যুক্তরাষ্ট্র বনাম যুক্তরাষ্ট্র বিরোধীদের! অথবা, যুক্তরাষ্ট্র যাকে তার স্বার্থ পরিপন্থী বলে মনে করবে৷ তাদের, রাজনীতির ধরণ হলো আইডিওলজি ভিত্তিক।

প্রথমে কমিউনিজমকে তারা স্বার্থ পরিপন্থী বানায় এরপরে ইসলামিজমকে! এখন, মধ্যপ্রাচ্যকে ছেড়ার পরে তারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললে, চীনের পরাশক্তি হিসেবে নব উত্থান ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠে পড়ে লেগে আছে।
বিশ্ব সম্ভবত, আবার দ্বিমেরুকেন্দ্রীক রাজনীতি দেখতে যাচ্ছে, অথবা নতুন ছায়া স্নায়ুযুদ্ধ ২ এর শরীক হচ্ছে, যেখানে হয়তবা আবারও বিশ্ব মেতে উঠবে চীন বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খেলায়!

দেখা যাক, কার অর্থনৈতিক নীতি জয় লাভ করে!! চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভ নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াড এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক রাজনীতি!

লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে পৃথিবী ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here