সাইকস পিকো চুক্তি , কারণ, প্রভাব,পরিণতি

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
Content Protection by DMCA.com

ভূ রাজনীতি (আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী)
সাইকস পিকো চুক্তি , কারণ, প্রভাব,পরিণতি

যদি আপনি ট্রাইগ্রিস নদীতে দুটি মাছকে মারামারি করতে দেখেন তবে জেনে রাখুন এর পেছনে বৃটিশদের হাত আছে। মধ্যপ্রাচ্য; প্রাচীন সভ্যতার সুতিকাগার। একসময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধ-বিগ্রহ আর অশান্তি।

স্বৈরশাসক, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ- এগুলোকেই মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিয়তি। তবে এটাই কি হওয়ার কথা ছিল? খুব সম্ভবত না। আজকের আরব বিশ্বের এহেন দুর্গতির জন্য অনেকেই দায়ী করেন ১৯১৬ সালে হয়ে যাওয়া এক চুক্তিকে, ইতিহাসে যেটি সাইকস-পিকো চুক্তি নামে পরিচিত।

গোপন এই চুক্তিটি হয় ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মধ্যে। ব্রিটেনের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন স্যার মার্ক সাইকস এবং ফ্রান্সের পক্ষে ফ্রসোয়া জর্জ পিকো। আরবদের কাছে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা বাস্তবে রূপ দেয়ার কোনো ইচ্ছেই ব্রিটিশদের ছিল না। তারা বরং একইসাথে তাদের অন্য মিত্রদের সাথে আলোচনা করতে থাকে।

মিত্রশক্তি তথা ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ পরবর্তী অটোমান সাম্রাজ্যের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ঐক্যমতে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। ১৯১৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯১৬ সালের মে পর্যন্ত তাদের মধ্যে এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বৈঠক হয়। এই তিন পক্ষের মধ্যে ব্রিটেন ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী যারা আবার আরবদের সাথেও চুক্তি করেছিল!

১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সকাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বয়স তখনও ১৮ মাসের কম। মার্ক সাইকস নামক জনৈক ব্রিটিশ কুটনীতিবিদ লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিসে হাজির হন। তার হাতে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এবং মনে এই মানচিত্র কেমনভাবে কাটাছেড়া করা হবে সেই পরিকল্পনা!

কথিত আছে, দেশের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সামনে দাঁড়িয়ে স্যার মার্ক সাইকস মানচিত্রের মধ্যে নিজের আঙুল দিয়ে এক দাগ টানেন এবং বলেন, “আমি মরুভূমির মধ্যে একটি লাইন টানতে চাই। এমন একটি লাইন যার বিস্তৃতি হবে ‘Acre’ এর ‘e’ থেকে (তখনকার ফিলিস্তিন) ‘kirkurk’ এর ‘k’ পর্যন্ত (বর্তমানে যা ইরাকের মধ্যে)!” তখন কে জানত এরকম একটি লাইন টেনে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলা যায়!

মার্ক সাইকস তার পরিকল্পনায় জানান, ব্রিটিশরা এই লাইনের দক্ষিণ দিক এবং ফরাসিরা এর উত্তর দিক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। অনেক আলোচনা পেরিয়ে ১৯১৬ সালের ১৬ মে ব্রিটেনের মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রসোয়া পিকোর মধ্যে গোপন এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই সাজনভ এই চুক্তি অনুমোদন করেন।

যা ছিল সাইকস-পিকো চুক্তিতে:

প্রথম অংশটি বাগদাদ থেকে দক্ষিণে কুয়েত পর্যন্ত। এই অংশটি সরাসরি ব্রিটিশদের অধীনে থাকবে।

দ্বিতীয় অংশটুকু থাকবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান উত্তর ইরাক, জর্দান ও বর্তমান ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমি থেকে মিসরের সিনাই উপত্যকা পর্যন্ত এই অংশের বিস্তৃতি।

তৃতীয় অংশটি যা দক্ষিণ লেবানন থেকে তুরস্কের কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত থাকবে সরাসরি ফ্রান্সের অধীনে। সিরিয়া মরুভূমির অংশটি যাবে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে।

এই অংশটি ঐতিহাসিক জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে। এর সর্বধর্মীয় গুরুত্ব থাকার কারণে এটি থাকবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে। সাইকস-পিকো চুক্তিতে রাশিয়ার জারকে দেয়া হয় ইস্তাম্বুল, বসফরাস প্রণালীসহ বর্তমান তুরস্কের অনেকটুকু।

চুক্তির প্রভাবঃ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়েয় মাধ্যমে পতন হয় অটোমান সাম্রাজ্যের। হুবহু সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ঠিক না করলেও এর প্রভাব রয়ে যায়। এই চুক্তিকে ভিত্তি ধরেই ১৯২০ সালের সান রেমো কনফারেন্সে প্রস্তাবিত ম্যান্ডেট পদ্ধতির মাধ্যমে আরব বিশ্বকে ভাগ করা হয়।

প্রথমত সাইকস-পিকো এবং পরবর্তী অন্য কোনো চুক্তিতেই আরব বিশ্বের মতামতকে গ্রহণ করেনি ব্রিটেন ও ফ্রান্স। বরং তারা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিবেচনা করেনি আরবদের স্বার্থ। ঔপনিবেশিক ব্রিটেন ও ফ্রান্স সীমান্ত নির্ধারণ করার সময়ে এ অঞ্চলের জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় পার্থক্য বিবেচনা করেনি, যার ফলশ্রুতিতে একই কুর্দি জাতি বিভিন্ন দেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আবার শিয়া-সুন্নিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত পার্থক্য থাকলেও তৈরি হয় এদের নিয়েই কোনো কোনো দেশ।

ব্যালফুর ঘোষণা:

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্রিটেন একইসাথে শুধু আরব এবং ফ্রান্সের সাথেই চুক্তি করেনি, বরং ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গড়ার ব্যাপারে জায়নিস্টদের প্রতিশ্রুতি দেয়! তখনকার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফুর জায়নিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা লর্ড ওয়াল্টার রথসচাইল্ডের কাছে লেখা এক চিঠিতে এই প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর লেখা এই চিঠি পরবর্তীতে ‘ব্যালফুর ডিক্লারেশন’ নামে পরিচিতি পায় যা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাইকস পিকো চুক্তি , কারণ, প্রভাব,পরিণতি ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।