যেভাবে আধুনিক তুরস্কের জন্ম

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
Content Protection by DMCA.com

যেভাবে আধুনিক তুরস্কের জন্ম

যেভাবে তিনটি মহাদেশ জুড়ে উত্থান হয়েছিল অটোমান সাম্রাজ্যের? কেন পতন হলো এই বিশাল সাম্রাজ্যের? যেভাবে আধুনিক তুরস্কের জন্ম!

আধুনিক তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম যে বিষয়টি নিয়ে জনা উচিত তা হলো অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্য।

দীর্ঘ ছয়শো বছর শাসন করা এই সাম্রাজ্য উত্থান, সাম্রাজ্যের বিস্তার, পতন ও সবশেষ মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্কের জন্ম ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরার চেষ্টা করবো এই পোস্টে।

(A quick disclaimer: দীর্ঘ ৬শ বছরের ইতিহাস এক-দুইটা পোস্টে বর্ণনা করা আদৌও পসিবল না। খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে দীর্ঘ ছয়শো বছরের ইতিহাস এখানে তুলে ধরার কারনে আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর না মিললেও অনেক ব্যাসিক প্রশ্নের উত্তর মিলবে আশাকরি। বিশাল এই ইতিহাস আমার পক্ষেও ভালোভাবে জানা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তাই ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ।)

১২৯৯ সালে অভ্যুদয় হয় অটোমান সাম্রাজ্যের। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ এই তিনটি মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত অটোমান সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ছিলো দীর্ঘ ৬শ বছর। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিনেন তুর্কি বংশোদ্ভূত ওসমান গাজী, যিনি প্রথম ওসমান হিসেবে অধিক পরিচিত। তাই অটোমান সাম্রাজ্যকে তার প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে ‘উসমানীয় সাম্রাজ্য’ও বলা হয়।

বিশাল এই সাম্রাজ্যের সীমানা ছিলো উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের হাঙ্গেরী, রাশিয়ার ক্রিমিয়া থেকে পূর্বে জর্জিয়া এবং জর্জিয়া থেকে দক্ষিণে আরবের ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত।

আজকের আধুনিক তুরস্কের বেশিরভাগ সীমানা আনাতুলিয়া নামের একটি উপদ্বীপের উপর বিস্তৃত। সহজ করে বললে আনাতোলিয়া হলো পশ্চিম এশিয়ার একটি উপদ্বীপ। বাংলাতে আমরা এই উপদ্বীপকে আনাতোলিয়া বললেও তুর্কিরা একে আনাদোল বা আনাদোলো (Anadolu) বলে থাকে। আনাতোলিয়াকে ইংরেজিতে এশিয়া মাইনর (Asia minor) নামেও ডাকা হয়।

মধ্য এশিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যকে ১০ শতক থেকে শুরু করে ১৪ শতক পর্যন্ত শাসন করেছিলো মুসলমানদের সেলজুক সাম্রাজ্য। এই মহান সাম্রাজ্যের স্থপতি সুলতান তুঘরিল বেগ জাতিতে ছিলেন একজন অঘুজ তুর্কি। ১২৯৯ সালে সেলজুক সাম্রাজ্য কর্তৃক উত্তরপশ্চিম আনাতোলিয়া উপদ্বীপের দ্বায়িত্ব পান তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রথম ওসমান।

ওসমানের পিতা আরতুগ্রুল আবার সেলজুক রাজবংশের জামাতা ছিলেন। প্রথম দিকে ওসমান সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত থাকলেও সেলজুক সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে এসে তিনি এই অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ধীরে ধীরে অটোমান সামাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১৩০০ সাল থেকেই একে একে বিভিন্ন অঞ্চল জয় করতে শুরু করে ওসমানের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। এস্কিসেহির, বিলেজিক, ইনোনু, ইয়েনিশোহির ও বার্সার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ ও নগর নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।

তখনকার যুগে বার্সা ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। তাই ওসমানের বার্সা নগর জয়ের কারনে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের মানচিত্রে অটোমানরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠলো।

এরপর বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েন ওসমান। তখন তার অসামাপ্ত কাজ সম্পাদনের ভার পরে বড় ছেলে ওরহান গাজীর হাতে।

ক্ষমতা হাতে পেয়েই সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন ওরহান এবং আনাতোলিয়ায় বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। বাবার মতো ওরহান গাজীও আশেপাশের বিভিন্ন নগর দখল করতে থাকে।

ওরহানের দখল করা বুরসা, ইজমিত, ইজনিক ও বেরগামা শহরগুলো উসমানীয়দের শক্তিশালী ঘাটি হয়ে উঠে। এরপর ১৩৬২ সালে নিজের জয় করা বুশরায় দেহত্যাগ করেন ওরহান।

ওরহানের মৃত্যুর পর একে একে ক্ষমতায় আসেন প্রথম মুরাদ (১৩৬১-১৩৮৯), প্রথম বায়েজিদ (১৩৮৯-১৪০২), প্রথম মুহাম্মদ (১৪১৩-১৪২১), দ্বিতীয় মুরাদ (১৪২১-১৪৪৪) দ্বিতীয় মুহাম্মদ (১৪৪৪-১৪৪৬) ও দ্বিতীয় মুরাদ (১৪৪৬-১৪৫১) প্রথম সুলায়মান (১৫২০-১৫৬৬), তৃতীয় মুরাদ (১৫৪৭-১৫৯৫), তৃতীয় মুহাম্মদ (১৫৯৫-১৬০৩) ইত্যাদি প্রভাবশালী শাসকদের হাত ধরে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছায় অটোমানরা। তবে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথমদিককার সুলতানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ওসমান গাজী, ওরহান গাজী, প্রথম মুরাদ ও প্রথম বায়েজিদ।

১৪৫৩ সালে ওসমানের বংশধর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের কনস্টান্টিনোপল জয় করার মাধ্যমে অটোমানরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে উচ্ছেদ করে। ১৫২৬ সালে হাঙ্গেরি জয়ের পর ইউরোপের বলকান অঞ্চল সমূহ নিয়ে বড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দ্বিতীয় মুহাম্মদ রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন করেন। পশ্চিম ইউরোপের রাজ্যগুলোর সাথে বাইজেন্টাইনদের সম্পর্ক খারাপ ছিল বিধায় অধিকাংশ ইউরোপীয় অর্থোডক্স জনগণ উসমানীয়দের অধীনে থাকাকে সুবিধাজনক মনে করে।

১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে উসমানীয় সাম্রাজ্য বিস্তৃতির যুগে প্রবেশ করে। নিবেদিত ও দক্ষ সুলতানদের শাসনের ধারাবাহিকতায় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধি লাভ করে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য রুটের বিস্তৃত অংশ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করে। সুলতান প্রথম সেলিম পারস্যের সাফাভি সম্রাট প্রথম ইসমাইলকে পরাজিত করে দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করেন।

সুলতান প্রথম সুলাইমান ১৫২১ সালে বেলগ্রেড জয় করেন এবং উসমানীয়-হাঙ্গেরিয়ান যুদ্ধের এক পর্যায়ে হাঙ্গেরি রাজ্যের দক্ষিণ ও মধ্য অংশ জয় করে নেয়া হয়। পরবর্তীতে মোহাচের যুদ্ধে জয়ের পর তিনি বর্তমান হাঙ্গেরির পশ্চিম অংশ ও মধ্য ইউরোপীয় অঞ্চল ছাড়া বাকি অংশে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একইভাবে পূর্বে দিকে উসমানীয়রা পারস্যের কাছ থেকে বাগদাদ দখল করে নেয়। ফলে মেসোপটেমিয়া ও পারস্য উপসাগরে নৌ চলাচলের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আসে।

১৫৫৯ সালে প্রথম আজুরাম পর্তুগিজ যুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্য দুর্বল আদাল সালতানাতকে সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। এই সম্প্রসারণ সোমালিয়া ও হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পর্তুগিজদের সাথে প্রতিযোগীতার জন্য ভারত মহাসাগরে প্রভাব বাড়ানো হয়। অটোমান শাসক প্রথম সুলাইমানের শাসনের সমাপ্ত হওয়ার সময় তিন মহাদেশব্যপী সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

উপরন্তু সাম্রাজ্য একটি শক্তিশালী নৌ শক্তি হয়ে উঠে। ভূমধ্যসাগরের অধিকাংশ এলাকা উসমানীয়রা নিয়ন্ত্রণ করত। এই সময় নাগাদ উসমানীয় সাম্রাজ্য ইউরোপের রাজনৈতিক পরিমন্ডলের বৃহৎ অংশ হয়ে উঠে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব রোমান সাম্রাজ্যের সাথে তুলনা করা হয়।

১৬শ ও ১৭শ শতাব্দীতে বিশেষত সুলতান প্রথম সুলাইমানের সময় উসমানীয় সাম্রাজ্য দক্ষিণপূর্ব ইউরোপ, উত্তরে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিম এশিয়া, ককেসাস, উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকা জুড়ে , মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলসহবিস্তৃত একটি শক্তিশালী বহুজাতিক, বহুভাষিক সাম্রাজ্য ছিল। ১৭শ শতাব্দীর শুরুতে সাম্রাজ্যে ৩৬টি প্রদেশ ও বেশ কয়েকটি অনুগত রাজ্য ছিল। এসবের কিছু পরে সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়া হয় এবং বাকিগুলোকে কিছুমাত্রায় স্বায়ত্ত্বশাসন দেয়া হয়।

এবার আসি উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে। উসমানীয় সাম্রাজ্য সুদীর্ঘ ছয়শত বছরেরও বেশী ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে ইউরোপীয়দের তুলনায় ধীরে ধীরে তারা সামরিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে থাকে। যার ধারাবাহিক অবনতির ফলে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

শেষ দিকের শাসকরা এতবড় সাম্রাজ্যের দেখভাল করতে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে ফ্রান্স, ব্রিটেন আর প্রতিবেশী রাশিয়ার দিনে দিনে শক্তিবৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে থাকে অটোমানদের প্রতিপত্তি। মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে জাতীয়বাদী শক্তিগুলো।

সবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভুল নীতি বেছে নেয়ার ফল হিসাবে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় বিশাল এই সামাজ্য। তবে ভগ্নাংশ হিসাবে টিকে আছে আজকের তুরস্ক।

অটোমান সাম্রাজ্য ছিল বহু ধর্ম, বর্ণ এবং বহু ভাষার। এই দিকে থেকে ইউরোপীয়ান পণ্ডিতরাও একমত যে অটোমান শাসকেরা জোড় পূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করে নাই। কিন্তু সাম্রাজ্যের বিধর্মীরা রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য বিবেচিত হতো না এবং তাদের নিদৃষ্ট হারে ট্যাক্স প্রদান করতে হতো, যা নিয়ে বিক্ষব্ধ ছিলো খ্রিস্টান সম্প্রদায়। এরই মধ্যে শিল্পবিপ্লব ও ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই অটোমানের দুর্দিন শুরু হয়।

নব্য সংগঠিত ও সমৃদ্ধের পথযাত্রী খ্রিস্টান ইউরোপীয়ানদের জন্য অটোমান ছিল চ্যালেঞ্জ। অটোমান সাম্রাজ্যে বসবাসকারী খ্রিস্টানরা খুব দ্রুত রেঁনেসা পরবর্তী ইউরোপের শিল্প ও জ্ঞান সমৃদ্ধির পথে নিজেদের যুক্ত করে ফেলে।

অটোমান সাম্রাজ্যের বাসিন্দা হলেও পশ্চিমের সাহায্যে একটি নিজস্ব শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা সমৃদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের শরিয়া আইন, বিধর্মী ট্যাক্স এবং রাজনৈতিক আইসোলেশন তাদের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক রূপে দেখা দেয়।

ফরাসি বিপ্লবের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে এবং ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন এলাকার সুলতানী শাষনে বসবাসরত বলকান এলাকায় খুবই দ্রুত জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটে। জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রসার এবং প্রথম টার্গেটই হয় অটোমান সাম্রাজ্য। আর এদিকে প্রাচীন টেকনোলজী এবং ট্যাক্স নির্ভর অর্থনীতির ধারক অটোমান তুলনামূলকভাবে দিন দিন শক্তি হারাতে থাকে।

আর দুর্বল হতে থাকা অটোমান সাম্রাজ্যের উপর সংস্কারের জন্য বহিঃশক্তি মানে, ফ্রান্স , ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া, রাশিয়ার চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পায়। এবং নিজ বর্ডারের ভেতরের ভিন্ন ধর্ম ও ভাষার জনগণও সংস্কারের জন্য চাপ দিতে থাকে।

কিন্তু ইসলামি খেলাফতের ভেতর ধর্ম সংস্কার করার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছিল না তৎকালীন অটোমান সুলতানরা। এসবের ফলাফলে শক্তি হারিয়ে ১৮৩৯ থেকে অটোমানরা বাধ্য হয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। এই সংস্কারের নাম দেওয়া হয় “তাঞ্জিমাত”।

এসব সংস্কারের মাধ্যমে সাম্রাজ্যে বসবাসকারী বিধর্মী ও মুসলিমদের সামাজিক অবস্থান সমান করা হয়, বিধর্মী ও মুসলিমদের ট্যাক্স সমান করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার ডাক শুনতে পাওয়া জনগণ এসবে সন্তুষ্ট ছিল না। তার উপর সুলতানের আমলাদের দুর্নীতি এবং প্রাচীন সামরিক সরঞ্জাম ও শাসনের কঠোরতা ধরে রাখার পথে বাধা ছিল।

আর ইউরোপ থেকে মুসলিম অটোমানদের বিতাড়িত করার ৫০০ বছরের লালিত স্বপ্নতো তৎকালীন পরাশক্তি ফ্রান্স, ব্রিটেন আর রাশিয়ার তো ছিলই।

এদিকে সংস্কারের প্রথম ধাপের প্রতিক্রিয়া হলো খেলাফত পন্থীরা অটোমান শাসকদের প্রতি বিশ্বাস হারালেন। অন্যদিকে আরও বেশি সংস্কারের দাবিতে কঠোর অবস্থান নিলো পশ্চিমাপন্থি তথা সামাজ্যের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর। এই দুই শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে উঠতে পারছিলো না শাসকরা। ফলে দুর্বল থেকে অটোমান দুর্বলতর হয়ে পড়তে থাকে অটোমানদের বিশাল সাম্রাজ্য।

এই অবস্থায় ক্ষমতায় আসেন সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯)। তিনি শরিয়া ও খেলাফতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অটোমান সাম্রাজ্যভুক্ত খ্রিস্টান অঞ্চলগুলোতে বাস্তবায়িত সেক্যুলারিজমের সংস্কার স্থগিত করে ফের আবার ইসলামিক পুনরুত্থানের চেষ্টা করেন এবং যথারীতি ব্যর্থ হন।

সুলতান আব্দুল হামিদের এই প্রচেষ্টার ফলাফল হয় আরো খারাপ, এবার অটোমান শাষকগোষ্ঠির ভেতর থেকেই প্রতিরোধ তৈরি হয়। গঠিত হয় তরুন তুর্কী গুপ্ত সংগঠন, ইয়ং তুর্ক। যারা ১৯০৮ সালে সফল বিদ্রোহের মাধ্যমে সুলতানকে একপ্রকার পুতুলে পরিনত করে এবং অটোমান সাম্রাজ্যে সুলতানি শাষনের ইতি ঘটায়। এই গোষ্ঠটি সংসদ কার্যকর করে নিজেরা আড়ালে থেকে ১৯২৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত সুলতানি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন করে।

তরুন তুর্কীদের নিয়ন্ত্রনে দুর্বল অটোমান ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করলেও ততদিনে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে গেছে। দিকে দিকে বিদ্রোহ এবং রাশিয়া ও ইউরোপিয়ান শক্তির সাথে যুদ্ধ হচ্ছে এবং অটমানরা তাদের ভূখণ্ড হারাচ্ছে। এদিকে সাম্রাজ্যের প্রতিপক্ষ রূপে তুর্কী’র নিজস্ব জাতীয়তাবাদও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সাম্রাজ্যের আনাতোলিয়াকে কেন্দ্র করে।

এমন সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। তখন অটোমান সাম্রাজ্যের দুর্বল শাসক জার্মানির সাথে সন্ধি চুক্তি করে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অসময়ে জার্মানীর সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়ে পরাজিত হয়। যুদ্ধের মাঝেই অটোমানের আরব অঞ্চলগুলো বিদ্রোহ করে বসে। সবশেষে পরাজিত অটোমান তাদের সাম্রাজ্য সম্পুর্ণভাবে হারায়। অটোমান শাসিত অঞ্চল দখল করে নেয় ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ বিজয়ী শক্তিগুলো।

তখন আধুনিক ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী তুর্কি জাগরণের নেতা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে আরম্ভ হয় আরেক যুদ্ধ। বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ী শক্তির হাত থেকে মাতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ। এই নতুন শক্তিটি ইস্তানবুল থেকে সরে গিয়ে আঙ্কারায় রাজধানী স্থাপন করে।

১৯১৯ থেকে শুরু করে ১৯২২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত সেই কঠিন যুদ্ধে জয়ী হয়ে শেষপর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র আনাতোলিয়া বাঁচাতে সক্ষম হয় আতাতুর্ক বাহিনী। পরবর্তীতে তিনি বর্তমান তুরস্কের জনক বা আতাতুর্ক হিসেবে স্বীকৃত হন।

তিন বছরের যুদ্ধ শেষে ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর আধুনিক তুরস্কের জন্ম হয়।

ক্রেডিটঃ Muhammad Miraj Mia(রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।)

যেভাবে আধুনিক তুরস্কের জন্ম ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।