ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস

34
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
Content Protection by DMCA.com

ভূ রাজনীতি (আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী)
ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস

ভিয়েতনাম যুদ্ধ এমনেকটি যুদ্ধ যেখানে কোনো পরাশক্তি টিকতে পারে নি। আমেরিকা যেখানে সর্বপ্রথম শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। যেকোনো ঘটনা ঘটলে, তার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে হয়। কারন, কোনো কারণ ছাড়া যেমন এমনি এমনি কিছু ঘটে না, তেমনি তার প্রভাব দেখা যায় না। তাই, প্রভাব ও ফলাফল কারনের উপর নির্ভরশীল ।

ঠিক তেমনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হলে আগে আমাদের এ যুদ্ধ সংঘটিত হবার পেছনের কারণ গুলো জানতে হবে। চলে, যেতে হবে পেছনের গল্পে। দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের উত্তর দিকে রয়েছে চীন এবং, লাওস ও কম্বোড়িয়া -এই তিনটি দেশ হলো এর প্রতিবেশি। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম -এই তিনটি দেশ ছিল পূর্বে ফ্রান্সের উপনিবেশ। এই জন্যে, এই দেশ তিনটিকে আগে ফ্রান্সের উপনিবেশ ইন্দোচায়না বলা হতো।

ফ্রান্স এখানে এসেছিল ১৮০৭ সালে এবং ১৯৪১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, জাপান ফ্রান্স সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের অর্থাৎ মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে ছিল। জাপান তাই এ সকল দেশগুলোকে আক্রমণ করে বসে এবং ইন্দোচায়নাকে নিজের দখলে নিয়ে আসে। ১৯৪১-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই দেশগুলো -লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম -জাপানের অধীনে ছিল।

১৯৪৫ সালে আমেরিকা কর্তৃক জাপানের ধ্বংস হওয়ার পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। তখনও, ভিয়েতনাম জাপানের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই জাপানিজ সৈন্যরা ভিয়েতনামে অবস্থান করছিল। কিন্তু, জাপান যুদ্ধে হেরে যাওয়া পর, জাপানিজ সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে। ভিয়েতনামের উত্তরাংশের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে চায়নার কাছে। কারন, চায়নাও ছিল তখন একটি এলিট শক্তি। ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা -এদের সাথে চায়নাও মিত্রশক্তিতে ছিল। আর, এই চায়না যুদ্ধ করেছিল উত্তর ভিয়েতনামে, তাই জাপানিজ সৈন্যরা উত্তর দিকে চীনের কাছে সমর্পণ করে।

অন্যদিকে, ভিয়েতনামের দক্ষিন দিকে ব্রিটেনের সৈন্যরা জাপানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। যার ফলে, দক্ষিনাংশের জাপানিজ সৈন্যরা ব্রিটেনের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল। এভাবে, ঠিক কোরিয়ার মত ভিয়েতনামও দুটি পরাশক্তির কাছে হস্তগত হয়ে দুটি দেশে বিভক্ত হয়ে গেল। এখন, কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বহিরাগত দুটি শক্তি এসে যুদ্ধ করে ফ্রান্সের উপনিবেশে দখলদারিত্ব কায়েম করল, সেক্ষেত্রে ফ্রান্স কি চুপচাপ এ বিভাজন সহযেই মেনে নিল?

উত্তর ,না৷ ফ্রান্স তার হৃত কর্তৃত্ব ফিরে চাইলে, তখন ব্রিটেন এতে তেমন আপত্তি না জানালেও, চীণ ভিয়েতনামের উত্তরাংশের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে নারাজ হয়! ১৯৪৬ সালে ফ্রান্স এই অঞ্চলে আবার কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চাইল। এবং, সেই চাওয়া থেকে একটা যুদ্ধ বেঁধে গেল যার নাম প্রথম ইন্দোচায়না যুদ্ধ (১৯৪৬-১৯৫৪)।

এ যুদ্ধ হওয়ার প্রধান কারন ছিল, ভিয়েতনামের স্থানীয় অধিবাসীরা স্বাধীনতা চাইত এবং তাদের এ স্বাধীনতার প্রবক্তা ছিলেন হো চি মিন। হো চি মিনের পার্টির নাম ছিল ভিয়েত মিন। এ, পার্টির অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই ছিল। তারা, সেই ১৯৪১ সাল হতেই জাপানী বহিঃশক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। তাই, ১৯৪৫ সালে জাপানের চলে যাওয়ার কিছু পরেই, আধিপত্যের জেরে আবার যুদ্ধ বাঁধে ফ্রান্সের সাথে ১৯৪৬ সালে। এ যুদ্ধ স্থায়ী হয় ছয় বছর পর্যন্ত! এ যুদ্ধে, একদিকে ছিল হো চি মিনের ভিয়েত মিন পার্টি, অন্যদিকে ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ও কিছু ফ্রেঞ্চ দরদী দাসানুদাস জনগোষ্ঠী, যারা ভিয়েতনামে থেকেও ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি অনুগত ছিল!

এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ফ্রান্স হেরে যায়! ঔপনিবেশিক ডানপিটে শক্তি ফ্রান্স হেরে যায় ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করা যুদ্ধবাজ জাতির কাছে! এ যুদ্ধের ভিত্তিতে, ১৯৫৪ সালে হয় ঐতিহাসিক জেনেভা চুক্তি- যেটায় বলা হয় যে এ ইন্দোচীন অঞ্চল তথা- ভিয়েতনাম, লাওস,কম্বোডিয়া থেকে ফ্রান্স তার ঔপনিবেশিক শক্তি সরিয়ে নিবে। ফ্রান্স এসব অঞ্চলে, তার দাবী প্রত্যাখ্যান করবে। সৈন্যদের দেশে ফিরিয়ে নিবে। আর, এই তিনটি দেশ স্বাধীনতা অর্জন করবে।

কিন্তু, ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে শান্তি বজায় রাখার জন্যে,(তখন, ভিয়েতনামে ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজমের দুই মতাদর্শিক ভেদাভেদের জন্য ছায়া স্নায়ুযুদ্ধ) চলছিল ভিয়েতনামের উত্তরে হো চি মিনের ভিয়েত মিন পার্টির নেতৃত্বে একটি দেশ গড়ে উঠবে। কারন, হো চি মিন ছিলেন একজন কমিউনিস্ট আর তার পার্টির আইডিওলজি ছিল কমিউনিজম। তিনি, কিছুকাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে অবস্থান করে সেখান থেকে রাজনৈতিক দীক্ষা নিয়েছিলেন,আর তাই চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই হো চি মিনের দলকে সমর্থন করত। তাহলে, উত্তর ভিয়েতনামে গঠিত হলো একটি কমিউনিস্ট দেশ।

অন্যদিকে, দক্ষিন ভিয়েতনাম। দক্ষিন ভিয়েতনামের নেতা ছিলেন নদিম দিয়েং। উনি, ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্লকের এবং ছিলেন ঘোর কমিউনিজম বিরোধী। তৎকালীন, ক্যাপিটালিস্ট বনাম কমিউনিস্ট- স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিফলন দেখা দেয় ভিয়েতনামের উপরও যার জন্যে, এ দেশটিও দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উত্তরাংশ কমিউনিস্টদের আর দক্ষিনাংশ ক্যাপিটালিস্টদের।

উত্তর ভিয়েতনামের রাজধানী ছিল হ্যানয় আর দক্ষিন ভিয়েতনামের রাজধানী সাইগন। হ্যানয়, আজও ভিয়েতনামের রাজধানী, আর সাইগনের নাম পরিবর্তন করে হো চি মিন সিটি রাখা হয়েছে। তার কারন হলো, পরবর্তীতে দক্ষিন ভিয়েতনাম হেরে যায় উত্তর ভিয়েতনামের কাছে আর উত্তর ভিয়েতনামের রাজধানী সাইগনের নাম রাখা হয় হো চি মিন সিটি।

১৯৫৫ সালে ফিরে যাই। উত্তর ভিয়েতনাম ছিল একটি কমিউনিস্ট দেশ যার নেপথ্যে সমর্থন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের- পিপলস রিপাকলিক অফ চায়নার! অবশ্য, পরে কিউবার মত ছোট ছোট কমিউনিস্ট দেশও উত্তর ভিয়েতনামকে সাপোর্ট করেছিল। অন্যদিকে, দক্ষিন ভিয়েতনামকে সহায়তা করেছিল ইউএসএস, ইউকে, ফ্রান্স সহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি। এর বড় একটি কারন ছিল স্নায়ুযুদ্ধ!

গোটা পৃথিবী তখন দুভাগে বিভক্ত ছিলো- একভাগে ছিল ক্যাপিটালিস্ট বুঁর্জোয়া পশ্চিমা দেশ গুলো আর আরেকভাগে ছিল সোশালিস্ট বা কমিউনিস্ট দেশগুলো। পশ্চাতে, জেনেভা চুক্তির ফলে বিভক্ত ভিয়েতনামে শান্তির দেখা মিলে নেই, বরং বিভাজন দিনে দিনে বাড়ছিল। এর কারন ছিল, দক্ষিনভাগের নেতা নদিম দিয়েং ছিলেন একজন তাঁবেদার দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা। তিনি গোটা দক্ষিন ভিয়েতনামে একজন স্বৈরশাসকের মত রাজত্ব করতেন। তিনি বহু বুদ্ধিস্টদের অমানবিকভাবে হত্যা করেন। বৌদ্ধ ধর্মের উপর আরোপ করেন নানান বিধি-নিষেধ। অথচ, ভিয়েতনাম হচ্ছে একটি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র! নদিম দিয়েং ছিলেন একজন কট্টরপন্থি ক্যাথলিক। অথচ, এই ক্যাথলিকরা ছিল সংখ্যালঘিষ্ঠ। আর এজন্যে নদিম দিয়েং, নির্মমভাবে বৌদ্ধদেরকে নির্মূল করার হত্যাযজ্ঞে মেঁতে ওঠেন।

তাই, ধীরে ধীরে নদিম দিয়েন এর জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকে আর দেশে গড়ে ওঠে তার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন। এই, নদিম দিয়েনের যারা বিরোধিতা করত তাদের মধ্যে একটি দল ছিলঃ ভিয়েত কং। এই, ভিয়েত কং দক্ষিন ভিয়েতনামে গেরিলা যুদ্ধ করত আর ভিয়েত কং ছিল ছিল একটি কমিউনিস্ট পার্টি। তাই, এই ভিয়েত কং এর উপর ছিল উত্তর ভিয়েতনামের নিরংকুশ সমর্থন। কারন, এই পার্টি চেয়েছিল ইউনিফিকেশন অর্থাৎ, উত্তর ও দক্ষিন ভিয়েতনামের একত্রীকরণ! দুটি দেশ এক হয়ে যাক- এটিই ছিল তাদের মুলমন্ত্র- জোরালো দাবী।

তৎকালীন জেনেভা চুক্তি মোতাবেক ঠিক করা হয়েছিল, দেশ দুটি স্থিতিশীলতা পাওয়ার দুই বছর পরে, একটি নির্বাচন সংগঠিত হবে। এবং,এই ভোটের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিন ভিয়েতনামের মিলন ঘটবে। তখন, এটি ঠিক করা হয়েছিল যে, দুই ভিয়েতনাম এক হয়ে যাওয়ার পরে যে দল নিরঙ্কুশ ভোটে জয়ী হবে, সে দল ক্ষমতা গ্রহন করবে ও গোটা ভিয়েতনাম এক শাসকের অধীনে থাকবে। অর্থাৎ, দুই ভিয়েতনামের এই যে বিভক্তি- তা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না, ছিল একটা অস্থায়ী সমাধান।

কিন্তু নদিম দিয়েন, এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। কারন, তিনি জানতেন, এ নির্বাচন সংগঠিত হলে, তিনি ভোটযুদ্ধে হেরে যাবেন। আর,এভাবে মার্কিনিদের সমর্থনে নদেম দিয়েন বেশ কয়েক বছর নির্বাচনকে এড়িয়ে এককভাবে রাজত্ব করতে থাকেন। এখন, প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, ইউএস্এ কেন নদেম দিয়েনকে সমর্থন করবে?!

কারন, আমেরিকা তখন কমিউনিজমের বিস্তার লাভ যেকোনো উপায়ে প্রতিহত করতে চেয়েছিল। তারা, ডমিনো তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিল। ডমিনো তত্ত্বানুসারে, একটি দেশ যদি কমিউনিস্ট হয়ে যায়, তবে এর আশে পাশের দেশগুলোও প্রভাবান্বিত হয়ে কমিউনিস্ট হয়ে যাবে, যেমনটা আমরা দেখি ডমিনো ব্লক খেলার সময়। একটি, ব্লককে ধাক্কা দিলে বা তার মধ্যের কোনো ব্লককে ধাক্কা দিলে যেমন পরপর বাকি ব্লকগুলিও পড়ে যায়, তেমনি মার্কিনিদের ভয় ছিল একটি দেশে কমিউনিজম খুঁটি গাড়লে, তা অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে আর তারা পশ্চিমা জোটকে কে টেক্কা দেয়ার মত, শক্তিশালী জোট বা ব্লক গঠন করবে। এই বিস্তার প্রতিহত করতে, তাদের করণীয় কি?! তারা, যেকোনো মুল্যে একটি দেশে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে দেবে না!

আর যেহেতু, উত্তর ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট হয়ে গেছে, সেহেতু দক্ষিন ভিয়েতনামকে কমিউনিস্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। আর, ঠিক এই কারণে তারা নদিম দিয়েনের মত দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা খুঁজে পায় তাদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে। ফলাফল,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই, দক্ষিন ভিয়েতনামকে কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা করতে, ১৯৫০ সাল থেকে, তারা প্রথমে মিলিটারি এডভাইজার পাঠানো শুরু করে, যাদের মুল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের ট্রেনিং দেয়া। যুদ্ধ করা নয় কিন্তু যুদ্ধনীতি তৈরি করা দেয়া।

তারা, বিভিন্ন প্ল্যান বনিয়ে দিত, পরিকল্পনামাফিক কার্যাবলি নির্দেশ করত। সময় ১৯৬২ অথবা ১৯৬৩ তখন,ইউএসএর প্রেসিডেন্ট ছিল জন এফ কেনেডি। তার, সময়কাল থেকেই ভিয়েতনামে এই পরামর্শদাতার সংখ্যা বাড়ানো হয়, এবং দিনে দিনে তা বাড়াতেই থাকেন জন এফ কেনেডি।

আমেরিকা কিন্তু অফিশিয়ালি এই যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিল না, কিন্তু “গলফ অফ টনকিনের’ ঘটনার পর আমেরিকা সরাসরি এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গলফ অফ টনকিন ভিয়েতনামে অবস্থিত। ১৯৬৪ সালের আগষ্ট মাসে, তিনটি মার্কিনি জাহাযের উপরে হামলা করেছিল, উত্তর ভিয়েতনামের তিনটি বন্দর। এ ঘটনার পরে, মার্কিন কংগ্রেসে একটি রেজুলেশন পাস করে যার মাধ্যমে সে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।

কিন্তু!! পরবর্তীতে জানা যায় যে এই গলফ অফ টনকিনের ঘটনাটি ছিল পুরোই সাজানো একটি নাটক! এই নাটকটি মঞ্চায়ন করেছিল স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র! কারন, ততদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাউথ ভিয়েতনামে একটি শক্তিশালী ভিত স্থাপন করেছে আর পরিকল্পনামাফিকই এবার সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি কথার বড়ই চলন আছে, ” আমেরিকা যার বন্ধু, তার শত্রুর আর দরকার নাই।”

ঠিক তেমমি, এবার উত্তর ভিয়েতনাম হয়ে গেল তাদের যুদ্ধক্ষেত্র! এই অযুহাতে, তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেসময়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জন। ১৯৬৭ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ লাখ সৈন্য পাঠিয়ে দিয়েছিল উত্তর ভিয়েতনামে। এ যুদ্ধে, তারা সবরকমের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। তারা, উত্তর ভিয়েতনামে প্রচুর বোমাবর্ষণ করেছিল। একটি পরিসংখ্যান মতে, এই ভিয়েতনাম যুদ্ধে যত বোমব ব্যবহৃত হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এতটা বোমব ব্যবহৃত হয় নি।

এ যুদ্ধে তারা বিভিন্ন নিউক্লিয়ার উইপেন বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল- উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, নিপম। এটি, এমনেকটি ক্যামিকেল যা গোটা জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। এছাড়াও, এজেন্ট অরেঞ্জ যা এক গাছ হতে অন্য গাছের সমস্ত পাতা ঝরিয়ে ফেলত। এই, সকল ক্যামিকেল উড়োজাহাযে করে স্প্রে করে দেয়া হতো উত্তর ভিয়েতনামের জঙ্গলে।

এসব, ক্যামিকেল এজেন্টের আগুন থেকে সাধারণ নারী, শিশু,বৃদ্ধ, যুবক, তরুন কেউই রেহাই পায় নি। সকলের গায়ে আগুন লেগে যায়। এভাবেই, দগ্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত মানুষ! আর, এজেন্ট অরেঞ্জ দিয়ে গাছের পাতা ঝরিয়ে ফেলত তারা, যাতে তারা গেরিলা যোদ্ধাদের কার্যকলাপ উপর থেকে দেখতে পারে! এই যুদ্ধে, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।

এ ভিয়েতনাম যুদ্ধের একটি বিশিষ্টতা হচ্ছে, এটি ছিল একটি গেরিলা যুদ্ধ তাই এ যুদ্ধটি বিভিন্ন জঙ্গলে, গিরিপথে, নদীর ধারে, গুহায়, টিলায়, পাহাড়ে, পর্বতে সংগঠিত হয়েছিল। হেলিকপ্টার করে মার্কিনি সৈন্যরা জঙ্গলে নামত। এ যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট পথ ছিল না, যাওয়া আসার। অন্যান্য, যুদ্ধে যেমন বন্ধর, শহর দখল করে, যুদ্ধ এগিয়ে চলত,ভিয়েতনামের যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা, জঙ্গলে নিয়ে আসতে বাধ্য করে মার্কিনি সেনাদের!

তাই, মার্কিনিদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল কারন তারা এই জঙ্গলের সাথে পরিচিত ছিল না, আর এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, রসদ,সরঞ্জামাদি, যুদ্ধযান আনা নেয়া করা সম্ভব ছিল না। তাই, তারা ক্যামিকেল এজেন্ট ব্যবহার করে, গেরিলা যোদ্ধাদের পরাস্ত করতে। কিন্তু, আদতে কি গেরিলা যোদ্ধাদের দমানো গিয়েছিল?!

উত্তর না, বরং গেরিলা যোদ্ধাদের এমন যুদ্ধনীতির কাছে হার মেনে গিয়েছিল ইউএস সৈন্যরা কারন এর আগে এমন যুদ্ধের সাথে, এমন বৈরি পরিস্থিতির সাথে তারা অপরিচিত ছিল। তাই তো, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনিদের শোচনীয় পরাজয়ের পর গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও, গেরিলা পদ্ধতিতে হয়েছিল। তাই তো, আমরাও জয় ছিনিয়ে আনতে পারি।

আর, অন্যদিকে ভিয়েত কং এর সেনারা এই জঙ্গলের সাথে খুবই পরিচিত কারন তাদের জন্ম, বেড়ে উঠা এসব অঞ্চলে। তাই, তারা জানত পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ খুব ভালো করেই বাস্তবায়িত হয় বলে, তারা এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিল। এছাড়াও, তারা নতুন আরেকটি যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করেছিল।

তারা, খুব ভালো করেই জানত যে, উড়োজাহাজ থেকে মার্কিনি সৈন্যরা তাদের গতিবিধি তদারকি করছে,এমনকি গাছের পাতা পর্যন্ত ঝরিয়ে দিচ্ছে। তারা,এও জানত জমিনে খোলা আকাশে খুব বেশি চলাচল করা যাবে না, খুব বড় ঘাঁটি বা স্থাপনা তৈরি করা যাবে না, কারন সবকিছু বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হবে।তাই তো, তারা বিকল্প পন্থা হিসেবে মাটির নিচে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে! সেই, টানেলে ঘাঁটি বেঁধে তারা সৈন্যদের পালটা আক্রমণ করত।

দেখা যেত, ইউএসের সৈন্যরা গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছে আর তারা তাদের গোপন সুড়ঙ্গপথে লুকিয়ে যেত আর সেখান হতে পালটা আক্রমণ করত অথবা নিরাপদে অবস্থান করত। সেখানে, খাদ্যপানি, অস্ত্রের যোগান -সবই ছিল। একেকটা টানেলের নেটওয়ার্ক ছিল বিশাল, অনায়াসেই তারা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে পারত! আর, মার্কিনি সেনাদের নাজেহাল করতে খুব একটা বেগ পেতে হত না ভিয়েতনামিজ কংদের।

এদিকে, ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন একটি পরিকল্পনা করা হয়। সেটি হলো ‘ TET Offensive ‘ বা আচমকা আক্রমণের প্ল্যান। প্ল্যানিংটা ছিল এইরকম যে, উত্তর ভিয়েতনাম হঠাৎ করে দক্ষিন ভিয়েতনামের মার্কিন সৈন্যদের উপর আক্রমণ করবে আর পুরো দক্ষিন ভিয়েতনামের শহর দখল করে নিবে।সায়গনের যে ইউএস এম্বাসি ছিল, সেখানে তারা আক্রমণ করে। বেশির ভাগ, আর্মি ক্যাম্পগুলোতে তারা আক্রমণ করে।

এছাড়াও, বহু সরকারি ভবনে তারা আক্রমণ চালায়। তবে, এই পরিকল্পনায় তারা সফল হতে পারে নি। তারা, পারে নি দক্ষিন ভিয়েতনামের পুতুল সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে দিতে। তবে,এই হামলাটি ছিল ভিয়েত কংদের জন্যে একটি বড় অনুপ্রেরণা। কারন, অনেকেই তখন মনে করেছিল আমেরিকার মত পরাশক্তির সাথে ভিয়েতরা পেরে উঠবে না। আমেরিকার কাছে আছে অত্যাধুনিক অস্ত্র, উড়োজাহাজ, আর পক্ষান্তরে ভিয়েতনামের কাছে আছে, দৃঢ় মনোবল আর গেরিলা যুদ্ধনীতি!

কিন্তু, এ হামলার পরে সকলে বুঝতে পারে ভিয়েত কংদের হারানো এতটা সহয নয়। ভিয়েত কংরা, দমে যায় নেই, এখনো তারা বহাল তবিয়ত আচগে, যেকোনো সময় দক্ষিন ভিয়েতনামের তাঁবেদার সরকারকে হামলা করে পালটে ফেলার ক্ষমতা রাখে! কারন, সেসময় আমেরিকা বিশ্বে ভুয়া প্রোপাগাণ্ডা ছড়ায় যে, তারা অল্প কিছুদিনের মধ্যে যুদ্ধে জিতে যাবে, ভিয়েত কংরা হার মেনে গেছে! কিন্তু, এ হামলার মাধ্যমে ভিয়েত কংরা তাদের অস্তিত্বের জানান দিল, যে তারা এখনো ‘নাই’ হয়ে যায় নি।

এই ‘টেট অফেনসিভের’ পরে অনেক প্রশ্ন জাগে বিশ্বমহলে, তারা আমেরিকার শক্তিসামর্থে সন্দিহান হয়ে পড়ে! ভিয়েত কংরা এতবড় হামলা কিভাবে করতে পারল, তারমানে আমেরিকা ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে, ভিয়েত কংরা যথেষ্ট শক্তিশালী-, প্রতীয়মান হয়। সেই সাথে, মার্কিন সাধারণ জনগনও প্রশ্ন তুলতে থাকে সরকারের কাছে, এ অন্যায় যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে! এ যুদ্ধ তারা কেন করছে, কার বিরুদ্ধে করছে?! ভিয়েতনামের সাথে কি সম্পর্ক?!

এছাড়াও, সেসময় অনেক ভয়াবহ ঘটনা বিশ্বমহলে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এরমধ্যে, একটি হলো, ‘মাই লাই গনহত্যা’। মার্কিন সৈন্যরা, মায়েলাই গ্রামে রাতের অন্ধকারে ঢুকে, বহু নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। বাদ যায় নি নারী আর শিশুরাও। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর, তারা গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। একটি বড় গর্ত করে, বহু লাশ তারা দাফন করে। অর্থাৎ, গণকবর দেয়। দৃশ্যটা কি পরিচিত লাগছে?! ঠিক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ ২৫ শে মার্চের কালরাত্রের মত!!

এসকল ঘটনা আমেরিকার পত্রিকাগুলো ছাপাতে থাকে। গোটা আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে। সাধারণ জনগনের মধ্যে দেখা দেয়, ক্ষোভ আর বিক্ষোভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ করতে থাকে, তাদের সাথে সাধারণ জনগনও যুক্ত হয়। আমেরিকা সরকার এবার চাপে পড়ে।

আরেকটি ঘটনা হলো,’ ড্রাফট অপজিশন ‘। তৎকালীন সময়ে, আমেরিকার নাগরিকদের-ছাত্র অথবা যাদের পড়াশুনা এখনো শেষ হয় নি,কিংবা যারা অসুস্থ তারা বাদে প্রায় সকল নাগরিককেই কিছু বছর সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে হতো। তখন, মার্কিন সাধারণ জনগন প্রতিবাদ করে এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। তারা, বলতে থাকে, এ যুদ্ধ ত আমাদের দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়, তাহলে আমরা কেন এ যুদ্ধে অংশগ্রহন করব?!
শুরু হয়, ড্রাফট অপজিশন।

উপরন্তু, শুরু হয় মিড়িয়া যুদ্ধ। এসময়ে, আমেরিকায় প্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নোয়ন সাধিত হয়। টেলিভিশনে ততদিনে মাইলাই গনহত্যার চিত্র, খবর, ভিড়িও যখন দেখানো শুরু হয়, তখন জনগন বাধ্য হয় প্রতিবাদ করতে।

আরেকটি বিষয় হলো, ‘পেন্টাগন রিপোর্ট ‘। এ রিপোর্টটি খবরে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যা ব্যাপক সাড়া জাগায়। এ রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে যে, সরকার মিথ্যা কথা বলছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আগামী ছয়মাস কি বছরেও জেতা সম্ভব নয়, তারা ভুয়া প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে! এ খবরে টেলিভিশনের মাধ্যমে, জনসাধারণের কাছে চলে যায়। ফলে, জনগন সরকার বিরোধী হয়ে যায়। সরকার জনপ্রিয়তা হারায়, ফলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে, ১৯৬৮ সালে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসে। সেসময় নিক্সন ভোটে দাঁড়ালে, তিনি ঘোষণা দেন, তিনি যদি ক্ষমতাসীন হোন তবে, ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি দিয়ে সৈন্য প্রত্যাবর্তন করাবেন। এতেই, তিনি লাভবান হন আর ভোটযুদ্ধে জিতে যান, অর্থাৎ নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রেসিডেন্ট হন।

তিনি, ক্ষমতায় আসার পর, ১৯৭০ সালে উত্তর ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য সরিয়ে দক্ষিন ভিয়েতনামে সৈন্য বাড়াতে থাকেন। এতে, সেখানে ভিয়েতনামিজ সৈন্য বাড়তে থাকে আর মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা কমতে থাকে। এ নীতিকে তিনি ‘ ভিয়েতনামাইজেশন’ বলে আখ্যা দেন। এরপর, ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তির মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিন ভিয়েতনামের সাথে থার্ড পার্টি হিসেবে আমেরিকা ছিল,তা সরিয়ে নেয়া হয় এবং উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দিয়ে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ততদিনে,ভিয়েতনামে থাকা সকল মার্কিন সৈন্যরাও স্বদেশে ফিরে গিয়েছিল। এরপর, বেশ কিছুদিন কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয় নি।

কিন্তু, প্যারিস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার মাত্র দু বছরের মাথায় চীনের সহায়তা উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিন ভিয়েতনামকে আক্রমণ করে বসে।তারা, দক্ষিন ভিয়েতনামের রাজধানী সাইগন দখল করে নেয়। তারাও, আসলে অযুহাত খুঁজছিল মার্কিমিদের অপসারণের পর তারা উত্তর ভিয়েতনাম দখল করে নিবে আর সম্মিলিত ভিয়েতনাম গঠন করবে।

১৯৭৫ সালের এপ্রিলে, দুই ভিয়েতনামকে একত্রিত করে কমিউনিস্ট শাসনাধীন এনে ” সোশালিস্ট রিপাকলিক অফ ভিয়েতনাম” নামে ইউনিফায়েড ভিয়েতনাম অর্থাৎ একটি নতুন কমিউনিস্ট স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। এ যুদ্ধে ৫৮,০০০ মার্কিন সৈন্য নিহত হয় আর প্রায় দেড়লাখের বেশি সৈন্য আহত হয়। প্রায় দশ থেকে বারো লাখ ভিয়েতনামের সাধারণ জনগন মারা যায় এবং বহু নিরপরাধ মানুষকে মার্কিন সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে।

এই ইউএস সৈন্যরা, দুই একজন ভিয়েত কং সেনাদের ধরার জন্যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। তবে, মজার বিষয় হলো, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এমনেকটি যুদ্ধ যেটি এই মার্কিনি সেনাদের মনোবল একদম ভেঙ্গে যায়, তাদের ধৈর্যহারা করে তোলে। কারন ছিল তাদের যুদ্ধনীতি। ভিয়েত কংরা অতর্কিত আক্রমণ করে, সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ত ফলে মার্কিনিরা তাদের আর ধরতে পারত না। এরপর, তারা কখনও স্থায়ী আবাসন গড়ত না যুদ্ধকালীন সময়। যাই তৈরি করত, তা বাঁশ দিয়ে তৈরি করত।

ফলে, একবার বোমা মেরে সেই স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার পরে, ভিয়েতনামিজরা আবার সেই বাঁশের স্থাপনা তৈরি করে ফেলত। এতে, মার্কিনিরা দারুন হতাশ হত! বলা হয়ে থাকে, এই যুদ্ধে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়, এরপর তারা ঠিক এরকম পরাজয়ের স্বীকার হয় আফগানিস্তানে! মার্কিনিদের শত চেষ্টাও ভিয়েতনামকে কমিউনিজমের কবল থেজে বাঁচাতে পারে নি।

পররাষ্ট্রনীতিতে এ যুদ্ধের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধের ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম চীনের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। সময়টা তখন, ১৯৭১। কারন, তদ্দিনে তারা বুঝে গিয়েছিল যে, ইন্দোচীন অঞ্চল তথা এশিয়ায় চীনের প্রভাবকে অস্বীকার করা যাবে না আর চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর ভিয়েতনামকে সহায়তা করছিল। ফলে, যদি চীনকে যদি এই ত্রিভুজ থেকে সরানো যেত তবে তারা কিছুটা স্বস্তি পেত, কারন দিনে দিনে তারা বুঝে গিয়েছিল যে ভিয়েত কংদের সাথে পেরে উঠা কঠিন। আবার এই সুযোগে, চীন ত বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে পাঁকা খেলোয়াড়, সে ‘পিং পং’ পলিসি আর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল সন্ধিক্ষণের ব্যবহার করে জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যপদ সহ নিরাপত্তা পরিষদে তাইয়ানকে সরিয়ে ভেটো প্রদানের ক্ষমতাটুকু লুফে নেয়। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বন্ধুত্বে, দীর্ঘদিনের বন্ধু ইউএসএসআর এর সাথে চীনের ভাতৃপ্রতিম সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরে!

অর্থাৎ, বলা যায় এ যুদ্ধের ফলে সর্বপ্রথম ক্যাপিটালিজম, কমিউনিজমের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করা শুরু করে ও ক্যাপিটালিজম-সোশালিজমের সম্পর্ক উন্নোয়নের ভিত স্থাপিত হয়।

অবশেষে, বলা যায় এ যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনাম সফল হয়, কারন দিনশেষ তারা তাদের স্বপ্নের ইউনিফায়েড ভিয়েতনাম গঠন করতে সফল হয়, দুই ভিয়েতনামকে একত্রীকরণ করে, একটি দেশে পরিণত করে যা কোরীয় যুদ্ধে কেউ পারে নি। আর, এসবই সম্ভব হয়েছিল, ভিয়েতনামের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা হো চি মিন আর ভিয়েত কংদের দুরদর্শিতা ও নিখুঁত পরিকল্পনার জন্যে। সেই সাথে, সাধারণ জনগনের অকুন্ঠ সমর্থন, আত্মত্যাগ, একতাবদ্ধতা, ধৈর্য ও সম্মিলিত প্রয়াসের৷ জন্যে, তারাই পৃথিবীকে দেখিয়ে দিল একটি জাতি বিনির্মাণে একতাবদ্ধতা কতটা জরুরি! তারা, দেখিয়ে দিল কেবল বড় বড় অত্যাধুনিক যান আর পারমানবিক শক্তির বলে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না, মনোবল দৃঢ হলে গেরিলা যুদ্ধ করেও একটি দেশ যুদ্ধে জিতে যেতে পারে!!

লেখিকাঃ ফারহীন ন্যান্সি (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

ক্রেডিটঃ Zakir BCS Page

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাস ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here