পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও বাংলাদেশের আর্শিবাদ

পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

Focus Writing
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও বাংলাদেশের আর্শিবাদ
৬ মে, ২০২১ (অনলাইন নিউজ)

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জনগণ সঠিক সিদ্ধান্তটি তাদের ব্যালটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে। চরম উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক দল বিজেপিকে সরাসরি প্রত্যাখান করেছে যেটা ভূরাজনৈতিকভাবে সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্যে সত্যিই মঙ্গলজনক।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের দিকে সচেতন বাংলাদেশিরা সেই প্রথম থেকেই চরমভাবে লক্ষ্য রাখছিলো কারণ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের বৃহত্তম রাজ্য হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার মধ্যে ১০টি জেলার সাথে বাংলাদেশের সরাসরি সীমানা আছে যার মধ্যে অধিকাংশ জেলাগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখানেই গভীর উদ্বেগের বিষয়টা। কারণ সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায়!

কেনো বিজেপি দলটিকে নিয়ে ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ চরম গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে থাকে বা সচেতন বাংলাদেশকে ভাবিয়ে তুলে? বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের ৫টি রাজ্যের মধ্যে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২টি রাজ্যে (আসাম ও ত্রিপুরা) বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন।

কেনো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

চিকেননেক করিডোর হিসেবে খ্যাত শিলিগুড়ির মাধ্যমে ভারত সেভেন সিস্টার্সখ্যাত রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ শিলিগুড়ির মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখন্ডের সাথে সেভেন সিস্টার্সখ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে সংযোগ করেছে। আর এই শিলিগুড়ি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গড়ে উঠা একটি শহর। উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসামে প্রবেশ করার মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করে।

চিকেননেক এর সামরিক গুরুত্ব:

ভারতের উত্তর-পূর্বাংশ সম্পূর্ণরূপে মূল-ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে যদি এই করিডোর বন্ধ হয়ে যায়। তাই এর সামরিক গুরুত্ব অনেক। অর্থাৎ, চিকেননেক করিডোর ব্যবহার করা ছাড়া ভারতের উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ থেকে কারও পক্ষে ৮টি রাজ্যে (সেভেন সিস্টার্সখ্যাত ৭ রাজ্য ও সিকিম) এবং স্বাধীন স্থলবেষ্টিত দেশ ভূটানে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তাই এটি ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে চাপে রাখতেও চীনের কাছে এটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি চিকেননেক করিডোরের উত্তরে ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে চীন-ভুটান-ভারতের মধ্যে ত্রিমুখী বিরোধ রয়েছে।

সেভেন সিস্টার্সখ্যাত ৭টি রাজ্যের মধ্যে ত্রিপুরা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল একটি রাজ্য এবং বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা যেমন হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনি ইত্যাদির সাথে সীমানা সংযোগ রয়েছে।NRC (National Register of Citizens) এর মাধ্যমে কিভাবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলো থেকে মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি বলে তকমা দিচ্ছে এবং উচ্ছেদের চিন্তা করছে?

ভারত প্রথম এই NRC আইনটি সামনে আনে আসাম রাজ্যে ২০১৬ সালে যখন BJP আসামে ক্ষমতাসীন হয় অর্থাৎ সেই বছর বিজেপি পক্ষে আসামের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন সর্বানন্দ সোনেওয়াল। তিনি এসেই ঘোষণা দেন অবৈধ বাংলাদেশি বিতাড়িত করবে। পরবর্তীতে NRC এর মাধ্যমে ১২টি শর্তের ভিত্তিতে একজন নাগরিককে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে বলে ঘোষণা দেন এবং আইনটি পাস করার ব্যবস্থা করেন।

এর প্রেক্ষাপটে NRC এর মাধ্যমে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনকে অভারতীয় অর্থাৎ অবৈধ নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেন ৩১ আগষ্ট, ২০১৯ সালে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরে একটি অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয় অর্থাৎ উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিলো ২০১৯ সালে।

তদ্রুপভাবে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যদি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতো তাহলে তারা পশ্চিমবঙ্গেও NRC চালু করতো যার ঘোষণা বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রায়ই ভাষণে উচ্চারণ করেছিলেন।

NRC এর ফলে বাংলাদেশে এই চাপটা কিভাবে পড়তো?

লক্ষ্য করুন, বাংলাদেশ তখন ত্রিমুখী চাপে পড়তো যেমন বাংলাদেশের:

  • পশ্চিম দিক থেকে (পশ্চিমবঙ্গ)।
  • উত্তর দিক থেকে (আসাম)।
  • পূর্ব দিক থেকে (ত্রিপুরা)।

অর্থাৎ বাংলাদেশকে এক ভয়ঙ্কর চাপে ফেলা হতো যেমনটা আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি দক্ষিণ দিক থেকে মিয়ানমার দ্বারা (প্রায় ৯ লক্ষ রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ বোঝা বহন করছে)। কিন্তু কোনো বিহিত ই করতে পারছে না বাংলাদেশ! ভারতও নিশ্চুপ বিষয়টি নিয়ে!

বাংলাদেশকে ৪ দিক থেকে চাপে ফেলার জন্যে মিয়ানমারকে নিয়ে ভারতের ভয়াবহ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও চক্রান্তসমূহ! আমরা জানি, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের পূর্ববঙ্গে প্রবেশের জন্যে জল, স্থল করিডোর (ট্রানজিট নয়!) ব্যবস্থা নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের ক্ষমতা পালাবদল সংক্রান্ত কোনো অভ্যন্তরীণ কারণে যদি এই করিডোর ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে যাতে মিয়ানমারকে নিয়ে এই করিডোর ব্যবস্থা চালু রাখতে পারে সেজন্য ‘‘কালাদান মাল্টি মডেল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’’ চালু করে ভারত।

বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ‘‘সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর’’ বন্ধ হয়ে যায় ভারতের বাধার কারণে। এখানে বিনিয়োগের কথা ছিলো চীনের। এই দ্বিমুখী দ্বন্ধে বাংলাদেশ ব্যালেন্স করতে না পেরে এই প্রকল্প থেকে সরে আসে! ফলে ভারতের একটি শক্তিশালী বাধা খুব সহজে দূর হয়ে যায়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ চীন থেকে নবযাত্রা ও জয়যাত্রা নামে ২টি সাবমেরিন ক্রয় করে চীনের নিকট থেকে, যেটি ভারত মোটেও সহজভাবে নেয় নি!

কি দেখতে পেলাম আমরা এর প্রেক্ষাপটে? ভারত সম্প্রতি তার ‘‘আইএনএস সিন্ধুবীর’’ সাবমেরিনটি মিয়ানমারকে হস্তান্তর করে যাতে বাংলাদেশকে দক্ষিণ দিক থেকে মিয়ানমারকে দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চাপে রাখতে পারে। আপনারাই বলুন, একটি ছোট রাষ্ট্র যদি এই চর্তুদিক থেকে চাপে পড়ে তখন তার কি অবস্থা হতে পারে! একজন সচেতন নাগরিক একটু সহজে চিন্তা করলে বিষয়টি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারে।

তাই বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভয়াবহ দাবানল থেকে উৎরিয়ে দিলো বিজেপির কাছ থেকে। বাংলাদেশ মমতার কারণে তিস্তা নদীর পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? আমাদের অনেকের দৃষ্টিতে এটা প্রতীয়মান যে, যদি BJP ক্ষমতায় আসতো তাহলে বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিস্তা নদীর পানি খুব সহজে উপভোগ করতে পারে। যদি এমনটি ভাবী আমরা, তাহলে এটি সম্পূর্ণ আই-ওয়াশ ছাড়া কিছু নয়!

BJP তিস্তা পানির হিস্যা বুঝিয়ে দিয়ে ভারত বন্দনা তৈরি করতো এবং পরবর্তীতে NRC এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে চরমভাবে চাপে ফেলে দিতো! বিশ্বাস করুন আর না করুন চরম ত্রাসে ফেলিয়ে দিতো! বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীদের বিভিন্ন জনসভার ভাষণের কথাগুলো শুনলেই স্পষ্ট বুঝা যায়! – NRC এর মাধ্যমে তারা কি না করতো এই অঞ্চলটাতে?

তিস্তা নদীর ইস্যুতে বাংলাদেশ কি করবে তাহলে?
বাংলাদেশ একটি চরম সুন্দর একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি হলো, চীনের মাধ্যমে তিস্তা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে – পানি সংরক্ষণ করা। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে, বর্হিবিশ্বে ভারতের ন্যায্যা পানি হিস্যা তুলে ধরা এবং চীনের অফারটি সহজে গ্রহণ করা। ভারত যতই চাপ প্রয়োগ করুক না কেনো? বাংলাদেশ সে পথেই এগোচ্ছে।

ক্রেডিটঃ আব্দুস সাবুর সজীব

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও বাংলাদেশের আর্শিবাদ ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।