তৃতীয় বিশ্ব আসলে কী

পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

বিসিএস লিখিত প্রস্তুতি
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী
তৃতীয় বিশ্ব আসলে কী?

বিশ্ব অর্থনীতিকে অর্থনৈতিক মর্যাদার ভিত্তিতে বর্ণনার জন্য চার অংশে বিভাজনের একটি হচ্ছে এই ‘তৃতীয় বিশ্ব’। পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট পালটে গেছে এবং প্রয়োজনীয়তা ও যথাযথতারও অভাব ঘটেছে; কিন্তু টার্মটির যথেচ্ছ ব্যবহার আজও বিদ্যমান।

তৃতীয় বিশ্বের বদলে এখন মূলত যে পরিভাষাগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেগুলো হচ্ছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র, অনুন্নত অথবা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ (এলএমআইসি)।

অর্থনৈতিক বিভাজনের উদ্দেশ্যে বিশ্বকে বিভক্ত করার বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন এবং তত্পরবর্তী সময়ে দেসমূহের শ্রেণিবিন্যাস যেমন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বিশ্বের ধারণাগুলো সূচিত হওয়ার পর বেশ দ্রুতগতিতেই বিস্তার লাভ করেছিল।

এসবের আনুমানিক ব্যাপ্তিকাল ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকের প্রায় শেষ দিক পর্যন্ত। সার্বিকভাবে রাষ্ট্রসমূহ সচরাচর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয় অর্থনৈতিক পদমর্যাদা ও মূল আর্থিক পরিমাপকগুলোর দ্বারা, যেমন—মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি), মাথাপিছু জিডিপি, চাকরি প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের হার।

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নিম্ন উত্পাদন হার ও সংগ্রামী শ্রমবাজারের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণভাবেই প্রতিফলিত হয় তুলনামূলকভাবে নিম্নমানের শিক্ষা, দুর্বল অবকাঠামো, ত্রুটিতে ভরা পয়োনিষ্কাষণ, স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার ও জীবনযাপনে স্বল্পতর ব্যয়।

উন্নয়নশীল দেশসমূহ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নজরদাড়িতে থাকে নিবিরভাবে। অবকাঠামোর পাশাপাশি সর্বাত্মকভাবে অর্থনৈতিক পদ্ধতিগুলোর উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈশ্বিক সাহায্য দিতে ইচ্ছুক থাকে এ দুই বিশ্বখ্যাত আর্থিক সংগঠন।

উভয়েই আবার এমন সব দেশকে চিহ্নিত করে থাকে নিম্ন-মধ্যম অথবা নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বা এলএমআইসি অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে হয়ে উঠতে পারে ইপ্সিত লক্ষ্যস্থল, বিশেষত সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির সুবিধাদি কাজে লাগিয়ে, যারা দ্রুত ও অধিকতর মুনাফা লাভে ইচ্ছুক। যদিও এসব দেশে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিও থাকে অধিকতর।

সাধারণত একটি উন্নয়নশীল দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নৈপূণ্য প্রদর্শনকারী হিসেবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হলেও উদ্ভাবনী ও শৈল্পিক ব্রেকথ্রু তাকে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বসিয়ে দিতে পারে উন্নয়নের সিঁড়িতে।

স্নায়ুযুদ্ধ চলার সময় ফরাসি জনসংখ্যাতাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ আলফ্রেড সাওভি এই তৃতীয় বিশ্ব টার্মটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করায় তাকে এ বিষয়ের জনক মানা হয়। তিনি পর্যবেক্ষণ করে বের করেছিলেন যে, বেশ কিছুসংখ্যক দেশ, যেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই সাবেক উপনিবেশ, তারা পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত সমাজতন্ত্র—এ দুই নীতিগত দর্শনের কোনোটিই মেনে চলে না।

১৯৫২ সালে লা’অবজার্ভারভেচার নামক পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সর্বপ্রথম তিনিই ‘থ্রি ওয়ার্ল্ডস, ওয়ান প্লানেট’ এই চার শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। অবশ্য সবগুলো শব্দই ছিল ফরাসিতে।

বর্তমান সময়ে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই তিনটি সাধারণ শ্রেণির কোনো একটিতে পড়ে। যেগুলো হচ্ছে উন্নত, উদীয়মান ও প্রান্তবর্তী। বিশ্ব বিভাজন যে কোনোভাবেই হোক সার্বিকভাবে আভিবাসিক হয়ে এই তিন শ্রেণিতে এসে থিতু হয়েছে। উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে সর্বাধিক শিল্পোন্নত।

উদীয়মান রাষ্ট্রপুঞ্জের তালিকায় রাখা হয়েছে ঐ সব দেশকে, যারা নানাবিধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদর্শন করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের পরিমাপগুলো ততটা স্থিতিশীল নয়। প্রান্তিক বাজারগুলো হুবহু না হলেও প্রায় অনেকটাই পুরোনো শ্রেণিবদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের প্রতিফলন ঘটায়। অধিকাংশ সময়েই সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক সূচকসমূহ প্রদর্শন করে।

পার্থিব বিভাজনের ক্রমবিকাশ হয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক এবং অধুনালুপ্ত। এই যেমন উন্নয়নশীল দেশসমূহকে মূল্যায়নের একটি আবহমান যন্ত্র হচ্ছে এমএসসিআইয়ের ফ্রন্টিয়ার মার্কেটস ইনডেক্স।

এই সূচক অন্তর্ভুক্ত করেছে নিম্নোক্ত দেশগুলোকে—ক্রোয়েশিয়া, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, কাজাখস্তান, রোমানিয়া, সার্বিয়া, স্লোভেনিয়া, কেনিয়া, মৌরিশাস, মরক্কো, নাইজেরিয়া, তিউনিশিয়া, ওয়েমু, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনাম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও (ডব্লিউটিও) অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত করার প্রসঙ্গে বসে নেই।

উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত—শুধু এ দুই শ্রেণিতে পৃথিবীকে ভাগ করার প্রয়োজন মনে করে। এই শ্রেণিবিন্যাসের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই বলে যে কোনো দেশ স্বমনোনয়ন দিতে পারে, যদিও মর্যাদাসমূহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভাজন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে কিছু অধিকারও দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য-সুবিধাদি বৃদ্ধি ও ডব্লিউটিও কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতার আগে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দীর্ঘতর ক্রান্তিকালীন অনুমোদন দেয়।

ডব্লিউটিওর আনুষঙ্গিক ব্যাপার হিসেবে মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) নামক আরেকটি অর্থনৈতিক অবস্থার পরিমাপক বিকশিত হয়েছে। সব দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর মূল্যায়নের জন্য কাজটি করেছে জাতিসংঘ।

এইচডিআই পরিমাপ করে এবং পরে বিদ্যালয়ে ভর্তি, গড় আয়ু ও মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে একটি দেশের অবস্থান প্রকাশ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘ মিলে নিম্ন আর্থসামাজিক সূচকগুলো দিয়ে ৪৫টি দেশের একটা দলকে বর্ণনার জন্য ন্যূনতম উন্নত দেশসমূহ (এলডিসি) টার্মটি ব্যবহার করে।

কয়েক বছর অন্তর এই তালিকার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এই সূচকগুলো হচ্ছে মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদসমূহ (পুষ্টি, গড় আয়ু, মাধ্যমিক শিক্ষা, বয়স্ক সাক্ষরতা) এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলোর (জনসংখ্যার আকার, প্রত্যন্ততা, পণ্যদ্রব্য রপ্তানিতে একাগ্রতা, কৃষি, রপ্তানি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি) সমন্বয়।

৪৫ সদস্যবিশিষ্ট সেই তালিকাটা হলো—আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, বাংলাদেশ, বেনিন, বারকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, চাদ, কমোরস, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, জিবুতি, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, গিনি বিসাউ, হাইতি, কিরিবাতি, লাও পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক, লেসোথো, লাইবেরিয়া, মাদাগাস্কার, মালাউই, মালি, মৌরিতানিয়া, মোজাম্বিক, মিয়ানমার, নেপাল, নাইজার, রুয়ান্ডা, সাও টম অ্যান্ড প্রিন্সিপ, সেনেগাল, সিয়েরালিওন, সলোমন আইল্যান্ডস, সোমালিয়া, সাউথ সুদান, সুদান, টিমর-লেস্টে, টগো, টুভালু, উগান্ডা, ইউনাইটেড রিপাবলিক অব তাঞ্জানিয়া, ভানুয়াতু, ইয়েমেন ও জাম্বিয়া।

তৃতীয় বিশ্ব আসলে কী ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।