জাতিসংঘের রোহিঙ্গা-প্রস্তাবে বাংলাদেশের কী লাভ

143
পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

বিসিএস ও ব্যাংক
ফোকাস রাইটিং
জাতিসংঘের রোহিঙ্গা-প্রস্তাবে বাংলাদেশের কী লাভ

গত ১২ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৪৭তম সভায় ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি রেজ্যুলেশন বা প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয় এবং এটা নিয়ে মিডিয়ায়, আন্তর্জাতিক মহলে এবং কূটনৈতিক পাড়ায় বেশ আলোচনা হচ্ছে।

এর মূল কারণ হচ্ছে, জাতিসংঘে এর আগেও রোহিঙ্গাবিষয়ক বহু প্রস্তাব গ্রহণ করা হলেও এবারের প্রস্তাবের সঙ্গে অন্যান্য প্রস্তাবের পার্থক্য হচ্ছে, এ প্রস্তাবটা গৃহীত হয়েছে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। এর আগে যত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই চীন, রাশিয়া, জাপানসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশ হয় প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে কিংবা ভোটদানে বিরত থেকেছে।

২০১৭ সালে এত বড় জেনোসাইডের ঘটনা সংঘটন করার পরও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায়নি। জাতিসংঘের কোনো ফোরামে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের ইস্যু সামনে এনেও জাতিসংঘের সব সদস্য-রাষ্ট্রগুলোকে একটা প্ল্যাটফর্মে আনা সম্ভব হয়নি।

এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান পর্যন্ত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাবে সই করেনি। হয় বিরোধিতা করেছে, না-হয় ভোটদানে বিরত থেকেছে। আমরা অনেকে এটা বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে সমালোচনা করেছি কেননা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে মিত্রের সংখ্যা খুব একটা বাড়াতে পারেনি।

কিন্তু সে অসম্ভবকে বাংলাদেশ গত ১২ জুলাই সম্ভব করেছে। যদিও এ প্রস্তাব পাস করা নিয়ে জাতিসংঘের সদস্য-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নানান ধরনের তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং তীব্র মতভেদ হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব পাস হয়েছে।

এটা একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা যে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করানো সত্যিই একটি কঠিন কাজ এবং এ কঠিন কাজটি অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য। কেননা, রোহিঙ্গা সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ।

ফলে, রোহিঙ্গাবিষয়ক যেকোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ এক অনিবার্য অংশীজন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সর্বসম্মতভাবে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি প্রস্তাব পাস করিয়ে বাংলাদেশের কী লাভ? এ নিবন্ধে তার কিছু ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ পেশ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের গৃহীত প্রস্তাবে বাংলাদেশের কী লাভ বুঝতে হলে, এটা জানা জরুরি যে, পাস হওয়া প্রস্তাবে আসলে কী আছে। এই প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তিনটি :

(১) বাংলাদেশের অবদানকে স্বীকার করা,

(২) আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং

(৩) জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত ‘স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি’র রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ।

এ কারণেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাকে সাধুবাদ জানাতে হয়, কেননা এ রকম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সভায় একটি সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে পাস করানো সক্ষম হয়েছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সব পক্ষকে একমত করানোর জন্য প্রথম থেকেই সব স্তরে সব ধরনের চেষ্টা করেছি। অবশেষে কোনো রাষ্ট্রই এই রেজ্যুলেশনের বিরোধিতা করেনি।

’ যে চীন এবং রাশিয়া মিয়ানমার ইস্যুতে সব সময় অন্ধভাবে সমর্থন করেছে, তারা কীভাবে এ প্রস্তাব পাসে বিরোধিতা না-করে সমর্থন করেছে, সে প্রশ্নের উত্তরে পত্রিকান্তরে এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি একাধিকবার চীন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেছি এবং কথা বলেছি।

আমার অন্য সহকর্মীরা তাদের স্তরে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রেখেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তারাও কোনো বিরোধিতা করেননি।’ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, চীন এবং রাশিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা জায়গায় আনতে পারাটা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সমস্যার পথে বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এখন এই প্রস্তাবের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১. গৃহীত এই প্রস্তাবের একটি অন্যতম দিক হচ্ছে, ২০১৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখের পর মিয়ানমারে যে হত্যাযজ্ঞ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়, সে গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয় এবং বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশি এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সহযোগিতায় বাংলাদেশ চার বছর ধরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছে।

কিন্তু বিগত চার বছরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করায় বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখভালের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রতিবেশগত নানান সমস্যার বাইরেও একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশের ওপর পড়ে। জাতিসংঘে গৃহীত এ প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

২. এই প্রস্তাবের আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর যে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, এর জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বিচারের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ন্যায়-বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলার সূত্র ধরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটনের অভিযোগে যে বিচার চলছে, এই প্রস্তাবে সে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানানো হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধ যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তার প্রতিও সমর্থন জানানো হয়।

এখানেই এ প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য যে, চীন, রাশিয়া, জাপান এবং ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রায় সব সময়ই মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করেছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ন্যায়-বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে মামলা চলছে তার পক্ষে আনার অর্থ হচ্ছে, প্রকারান্তরে মিয়ানমার যে ২০১৭ সালে রাখাইনে গণহত্যা সংঘটন করেছে, তা স্বীকার করায় চীন ও রাশিয়ার সমর্থন আদায় করা।

এ ছাড়া এই প্রস্তাবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সব ধরনের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি যে অন্যায় এবং অবিচার হয়েছে তার বিচারের পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এখতিয়ার এবং দায়িত্বের কথা স্বীকার করা হয়।

৩. এই প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ২০১৮ সালের আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্টকে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে এবং সুপারিশের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে যখন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন হয়, তখনো বাংলাদেশে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। সে সময় জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।

মিয়ানমারের তখনকার স্টেট কাউন্সিলর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার ইস্যুতে তার অবস্থান দেখানোর জন্য এ কমিশন গঠন করলে তা বিশ্বব্যাপী বেশ প্রশংসিত হয়। কিন্তু আনান কমিশন ২০১৭ সালের আগস্টের ২৪ তারিখ রিপোর্ট দিলেও ২৫ আগস্ট থেকেই রাখাইনে নতুন করে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও জেনোসাইডের ঘটনা শুরু হয়।

ফলে, আনান কমিশনের রিপোর্ট এবং এর গুরুত্ব নতুন ঘটনার তীব্রতার তলে চাপা পড়ে যায়। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ঘটনা নতুন করে তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘ তিন সদস্যের একটি ‘স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিশন’ গঠন করে, যা ২০১৮ সালের আগস্টে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেও কফি আনান কমিশনের অনেক সুপারিশ পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

ফলে, গত ১২ জুলাই গৃহীত প্রস্তাবে যখন স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য জোর তৎপরতা চালানোর জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তখন কফি আনান কমিশন ও তথ্য-অনুসন্ধান কমিশনের রিপোর্টকে এক অর্থে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের গুরুত্বের কথা স্বীকার করা হয়।

পরিশেষে বলব, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত এই প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের লাভ হচ্ছে :

(১) রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে বড়মাপের মানবিক কাজ করেছে, সেটা জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে লিখিতভাবে রেকর্ডেড হওয়া,

(২) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার ভরণ-পোষণে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমবে,

(৩) চীন, রাশিয়া, জাপান ও ভারতকে একটা প্ল্যাটফর্মে আনতে পারার কারণে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের বাংলাদেশের পক্ষে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া,

(৪) আনান কমিশনের আলোকে স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হবে এবং

(৫) রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার যদি যথাযথ বিচার হয়, তাহলে রোহিঙ্গারাও রাখাইনে ফিরে যেতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে।

যদি এমনটা ঘটে তাহলে দীর্ঘ চার দশকের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের একটা দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশকে বর্তমান শরণার্থী আশ্রয়দানের পাহাড়সম বোঝা থেকে বেরিয়ে আসার পথ করে দিতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জাতিসংঘে এ রকম বহু প্রস্তাব গৃহীত হয়, মিয়ানমারের সামরিক সরকার এসব প্রস্তাবকে দুই আনা পাত্তাও দেয় না। ফলে, খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। তবুও, আশাবাদী হওয়া ছাড়া আমাদের এখন অন্য কোনো উপায়ও নেই।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় – ১৫ জুলাই, ২০২১ , দেশ রুপান্তর

জাতিসংঘের রোহিঙ্গা-প্রস্তাবে বাংলাদেশের কী লাভ ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here