কিভাবে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সূচনা হলো

35
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি
Content Protection by DMCA.com

কিভাবে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সূচনা হলো ,কেন সিরিয়া পরিনত হলো ভূরাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ডে, কে লড়ছে কার বিরুদ্ধে? কেন এখন এই যুদ্ধ ‘Endless War’এ রূপ নিয়েছে?

সম্প্রতি সিরিয়ার আইনসভার স্পিকার হামৌদা সাববাগ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ২৬ মে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়াতে পরবর্তী প্রেসিডেনশাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে (সূত্র- রয়টার্স)। তারপর থেকেই সিরিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এটা হবে সিরিয়ায় আয়োজিত দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আজকের এই পোস্টে আলোচনা করবো সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সূচনা কিভাবে এবং কেন সিরিয়া ভূরাজনীতির প্লে- গ্রাউন্ডে পরিনত হলো। (A Quick Disclaimer- এখানে গভীর আলোচনায় না গিয়ে শুধুমাত্র ব্যাসিক বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি)

সিরিয়াতে চলমান এই ক্রাইসিসটা বুঝতে হলে আপনাকে ফিরে যেতে হবে সেই আরব বসন্তে। আরব বসন্ত নিয়ে কয়েকদিন আগে আমার টাইমলাইনে বিস্তারিত একটা পোস্ট দিয়েছিলাম(৩১ নাম্বার পোস্ট)। এখানেও সংক্ষেপে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধির আশায় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিলো।

গণআন্দোলনের তোপে পতন হলো তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক বেন আলীর। তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক বিরোধী এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পরে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতে। একেক করে পতন হয়েছিলো মিশরের হুসনী মোবারকের, লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফির, ইয়েমেনের সালেহ এর মতো স্বৈরশাসকদের।

★ যেকারণে বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন আরব বসন্তের প্রভাব হয়তো সিরিয়াতে পরবে না★
অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, সিরিয়ায় হয়তো আরব বসন্তের প্রভাব পড়বে না। অবশ্য তার পেছনে কারনও ছিলো। প্রথমত, দেশটিতে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় বাসার আল-আসাদের বাথ পার্টি। পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলো বাথ পার্টি। দ্বিতীয়ত, বাশারের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কায়েমে অনেক সুন্নি মুসলিমেরও সমর্থন ছিল।

পরবর্তীতে দেখা গেল আরব বসন্তের হাওয়া সিরিয়াতেও লাগলো। ২০১১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ দেখা দেয়। তবে তা ছিল অন্যান্য আরব দেশগুলোর তুলনায় ছোট ও বিচ্ছিন্ন। প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদ তাঁর গদি টিকিয়ে রাখতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে থাকেন।

★যেভাবে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত★
আসাদ বিরোধী আন্দোলনের কারনে চারজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে সরকারি বাহিনী। দেশটির ডেরা শহরের এ ঘটনার প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সিরিয়ার জনগণ। সেখানে সরকারি বাহিনী ব্যাপকভাবে গুলি ছোড়ে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী মারা যান। তারপর সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। একপর্যায়ে আন্দোলনরত জনগনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর এক অংশ সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাত শুরু করে। এটা থেকেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত।

★যেভাবে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে★
পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে বাশার আল-আসাদ ট্যাংক, আর্টিলারি এবং হেলিকপ্টার গানশিপ সহকারে দেশব্যাপী অপারেশন চালাতে থাকে। মাত্র তিন মাসে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়। বিদ্রোহীরাও হয়ে উঠতে থাকে আরো শক্তিশালী। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ এতই জটিল, সঠিক হিসাব রাখা মুশকিল। সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, শহর দখল, সেই দখল থেকে আবার মুক্ত, আবার পুনর্দখলের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে বছরের পর বছর। নিহত হয় লাখ লাখ মানুষ, শরনার্থী হয়ে দেশ ত্যাগ করতে থাকে হাজারো সাধারণ মানুষ।

★বিদ্রোহীরা গঠন করে ফ্রী সিরিয়ান আর্মি★
এই বিদ্রোহীদের মাঝেও রয়েছে নানা দল-উপদল। বিদ্রোহীরা প্রথমে অগোছালো থাকলেও ধীরে ধীরে বাইরের সমর্থনে সংগঠিত হয়। তারা একত্র হয়ে একটি সংগঠিত ফোর্স গঠন করে। যার নাম দিয়েছে “ফ্রি সিরিয়ান আর্মি”। পশ্চিমারা আসাদকে হটিয়ে সিরিয়ায় তথাকথিত গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মাঠে নামে। রাশিয়া সব বিষয়ে বাশার আল-আসাদকে সহোযোগিতা করতে থাকে।

শিয়া ইরান ও ইরাক এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ বাশার আল-আসাদের পক্ষ নেয়। অন্যদিকে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ তুরস্ক, কাতার এবং সৌদি আরব আসাদবিরোধীদের সমর্থন করে। এভাবে সিরিয়া পরিনত হয় ভূরাজনৈতির এক প্লে-গ্রাউন্ডে।

★ বিদ্রোহীরা দখল করতে থাকে একের পর এক শহর★
১৯৮২ সালে বাশারের পিতা হাফিজ আল আসাদ মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর সামরিক অভিযানের আদেশ দিয়েছিলেন। সেই অভিযানে ব্রাদারহুডের হাজারো কর্মী নিহত হয়। সেই পুরনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্রাদারহুডের কর্মীরাও ফ্রি সিরিয়ান আর্মিতে যোগ দেয়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে “ফ্রি সিরিয়ান আর্মি” তুরস্ক থেকেও সরাসরি মদদ পায়।

২০১১ সালের অক্টোবরে বিদ্রোহীরা বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনীর ওপর ট্যাংক এবং হেলিকপ্টার সহযোগে প্রথম হামলা চালায় কোম শহর দখল করার জন্য। এরপর থেকে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি দেশের অনেক অংশ দখল করে। বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায় আলেপ্পার মতো বড়ো বড়ো শহরগুলো। দেশের নানা অংশে নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে বাশার আল আসাদ।

★ একমাত্র সিরিয়া ছিলো আরব বিশ্বে রাশিয়ার পা রাখার জায়গা★
কিন্তু বিদ্রোহীরা তাদের এই দাপট বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৫ সালে আসাদের পক্ষ নিয়ে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ পাল্টে দেয় সকল হিসেবনিকেশ। আসাদের জন্য সামরিক উপদেষ্টাও নিয়োগ করে রাশিয়া। তখন আরব বিশ্বে সিরিয়া ছাড়া রাশিয়ার আর ভালো কোন বন্ধু রাষ্ট্র ছিলো না। সিরিয়া ব্যাতিত মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার পা রাখার মতো কোন জায়গা ছিলোনা। তাই সিরিয়াকে বলা হয় রাশিয়ার ফুটহোল্ড (Foothold) বা পা রাখার জায়গা।

★কেন রাশিয়া বাশার আল আসাদের পক্ষ নিলো?★
আরব বিশ্বে রাশিয়ার সবচেয়ে ভালো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাসার আল আসাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার মিলিটারি ঘাঁটি তৈরি করে আরব বিশ্বের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে রাশিয়া অস্ত্র সাপ্লাই দিয়ে পাশে দাড়ায়। আসাদ সরকার সাধারণত ট্যাংক,বোমা, মিসাইল এ-সব দিয়ে বিদ্রোহীদের দখলকৃত জায়গায় আক্রমণ করতো। ট্যাংক- মিসাইলের প্রভাব বেশিদিন থাকতো না। আক্রমণের সময় বিদ্রোহীরা ঔসব অঞ্চল থেকে কিছুদিনের জন্য পালিয়ে যেতো কিন্তু আক্রমণের পর বিদ্রোহীরা পুনরায় এসব জায়গায় একত্রিত হয়ে কার্যক্রম চালাতো।

★রাশিয়ার সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ালো বাশার আল আসাদ★
তারপর ২০১৫ সালে রাশিয়া ও আসাদ মিলে ক্যামিক্যাল/বায়োলজিক্যাল ওয়েপন্স ব্যাবহার করে আক্রমণ চালাতে শুরু করে যেন বিদ্রোহীরা পুনরায় সরকারের দখলকৃত জায়গায় একত্রিত না হতে পারে। কেননা এসব রাসায়নিক অস্ত্রের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সাধারণ জনগনের মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্রের কারনে আতংক সৃষ্টি হয়। রাশিয়া সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ওপর সরাসরি বিমান থেকে বোমাবর্ষণ শুরু করে।রুশদের সহায়তায় একে একে দামেস্কের বড় অংশ ও আলেপ্পো শহরে নিজেদের হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় বাশারের সেনারা।

★যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সিরিয়াতে তার প্রবেশ নিশ্চিত করে★
আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা কমন বিষয় হলো রাশিয়া যেখানে আমেরিকাও সেখানে। রাশিয়া যাকে সমর্থন করে আমেরিকার তার বিরুদ্ধে বলে। যেহুতো রাশিয়া বাসার আল আসাদের পাশে দাড়িয়েছে, সেহেতু আমেরিকা বিদ্রোহীদের পাশে দাড়িয়ে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা শুরু করে। তারপর বারাক ওবামার নেতৃত্বে সিরিয়ায় বাসার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়তে এবং রাশিয়ার কতৃত্ব হঠাতে আইএস নামের এক জঙ্গি গোষ্ঠী সৃষ্টি করে। এই আইএস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার প্রবেশ নিশ্চিত করে।

★সিরিয়াকে যেকারণে ইরানের খুবই প্রয়োজন★
লেবাননে একটা রাজনৈতিক দল আছে। যার নাম হিজবুল্লাহ। পেলেস্টাইন এবং ইসরায়েলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলছে সেখানে লেবাননের রাজনৈতিক দল হিজবুল্লাহ পেলেস্টাইনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। এই হিজবুল্লাহকে আবার অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে ইরান।

হিজবুল্লাহ আর ইরান মিলে ইসরাইকে বসে রাখতে চাচ্ছে। তাই ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সহায়তা দিতে যে রাস্তা দিয়ে যেতে হয় সেটা হলো সিরিয়া। লেবাননে পৌঁছাতে ইরানকে সিরিয়ার রুট ব্যবহার করতে হয়।তাই ইরানের সিরিয়াকে প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকেই ইরান সিরিয়ার বাসার আল আসাদের পক্ষ নয়। তাছাড়াও ইরান মনে করেছিল, সিরিয়ায় আাসাদের পতন ঘটলে, সে তার মিত্র হারাবে।

★যেভাবে সিরিয়া পরিনত হলো প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে এবং এখন কে কার বিরুদ্ধে লড়ছে?★
প্রথমত- ইরান হিজবুল্লাহকে সহায়তা করছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে, দ্বিতীয়ত- ইরান বাসার আল আাসাদের পক্ষে। তাই ইসরায়েল আসাদের বিপক্ষে দাড়িয়েছে। এছাড়াও ইসরায়েল সবসময় আমেরিকার সাথে। আমেরিকা যেদিকে ইসরায়েল সেদিকে। তারপর থেকেই সিরিয়ার যুদ্ধ সরকার বনাম বিদ্রোহীদের মধ্যে না থেকে এই যুদ্ধ রুপ নেয় প্রক্সি যুদ্ধে। একপক্ষে রয়েছে আমেরিকা, ইসরায়েল, সৌদি, তুরস্ক, আইএস, মুসলিম ব্রাদারহুড ও সিরিয়ার বিদ্রোহী মিলিটারি। অন্যপক্ষে রয়েছে বাসার আল আসাদ, রাশিয়া, ইরান, ইরাক, হিজবুল্লাহ।

আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here