উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ও করোনা মোকাবেলায় চ্যালেঞ্জ

পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

বাংলাদেশ বিষয়াবলী
উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ও করোনা মোকাবেলায় চ্যালেঞ্জ (Bonik Batra 23 মে, ২০২১)

হাসান হাফিজুর রহমানের একটি কবিতার অংশবিশেষ ছিল এ রকম, ‘এখন রুদ্ধশ্বাসে বলা; কি করে এসেছি এখানে; এসেছি ঠিক, জানি না কিভাবে; জীবন একইসঙ্গে জ্বরতপ্ত আর ঊষর; অপেক্ষাই শুধু; অপেক্ষা কিছু একটার জন্য; অপেক্ষা করলেই সেটা আসবে; তারপর; কিছুই না, আবার অপেক্ষা?’ করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় পথ গুনছি সবাই। এই লকডাউনে ঢাকার গলিপথে বের হলেই দেখা যায়,

রিকশাওয়ালার অপেক্ষা, হকারদের অপেক্ষা, ছোট্ট তরকারির দোকানদারের অপেক্ষা। করোনা মহামারী শেষের অপেক্ষা। কবে পাব মুক্তি? অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শীতকালে মনে হলো শেষ হলো, কিন্তু না। এখন আবার লকডাউন শেষের অপেক্ষা।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা জানেন না বা এখনো বলতে পারেননি কবে শেষ হবে এ মহামারী। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ আধিবেশনে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলবে। এদিকে করোনা মহামারী। কীভাবে হবে এ অবস্থায় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ? কী হতে পারত আমাদের জন্য করণীয়?

উন্নয়নশীল দেশ হতে শর্ত কী?

কী শর্ত পূরণ করেছি আমরা? প্রধানত, তিনটি মূল শর্ত পূরণ করতে হয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে এগিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের ২০২০ সালে ছিল ১৮২৭ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় শর্ত, মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশে হতে লাগে ৬৬ পয়েন্ট।

সেখানে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ৭৫.৩ পয়েন্ট অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোনো দেশ ৩৬-এর বেশি হলে তাকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেয়া হয় না। ৩২-এ আসার পর থেকে নিচের দিকে যত কম হবে তত ভালো। বাংলাদেশের এ পয়েন্ট এখন ২৫.২।

সুতরাং করোনা মহামারীর মধ্যেও এ ধারা ধরে রাখতে হবে। এসব উন্নয়নের কারণেই পৃথিবীর বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ষাঁড় উল্লেখ করেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? এখানে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে আমাদের দেশের মানবসম্পদ। এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা বাংলায় জনমিতিক লভ্যাংশ।

জনমিতিক লভ্যাংশ কী?

একটি দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ যদি কর্মহীন জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে এ অবস্থাকে জনমিতিক লভ্যাংশ বলে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে দেশটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিপোর্ট অনুসারে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মানুষের বয়স ছিল এই সীমার মধ্যে, যা ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশ। কিন্তু জনমিতিক লভ্যাংশের এ সুবিধা মাত্র ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে এবং তারপর কমতে থাকবে।

সুতরাং এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে না এগিয়ে নিতে পারলে আরো অনেক দিন পিছিয়ে যাব। এর আগে সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া তাদের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কিন্তু নাইজেরিয়া কাজে লাগাতে পারেনি। সুতরাং, ভাবতে হবে কীভাবে করোনা মহামারীর মধ্যেও জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানো এবং উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ধারা ধরে রাখা সম্ভব?

লকডাউন কতটা কার্যকর?

লকডাউনের জন্ম হয় ৫২৭-৫৬৫ খ্রি. জাস্টিয়ান যুগে প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তত্কালীন সময়ে মানুষ জানত না কীভাবে রোগটি ছড়ায়। ফলে এটাই ছিল একমাত্র পদ্ধতি। কিন্তু এ পুঁজিবাদের যুগে জনমিতিক লভ্যাংশের একটি দেশে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ এত কর্মক্ষম মানুষকে আটকে রাখা কঠিন। কারণ মানুষ করোনায় মৃত্যু বা আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে কাজ করে খেয়ে বেঁচে থাকাটাকে বেশি প্রয়োজন ভাবছে। এছাড়া গণমাধ্যমের সংবাদের ভিত্তিতে বলা যায়, এরই মধ্যে নতুন করে আরো দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

ফলে লকডাউন গত বছর মানুষ মানলেও এবার মানার প্রবণতা কম দেখা যাচ্ছে। আমাদের আরো কিছুদিন করোনা মহামারীর মধ্যে বসবাস করতে হবে ধরে নিয়েই স্থায়ী পদ্ধতি নিতে হবে। কী হতে পারে? এরই মধ্যে অনেক দেশ করোনা ভালোভাবে মোকাবেলা করেছে। তার মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। সেই ভিত্তিতেই কিছু বলব।

জাপানিজ পদ্ধতি কী?

কেউ ভাবতেই পারেন জাপান যেহেতু অনেক উন্নত, সুতরাং অনেক ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা বাংলাদেশে সম্ভব না। যদিও দেখা যাচ্ছে আবার কিছুটা বেড়েছে জাপানে। জাপানে সরকার থেকে মাত্র তিনটি নির্দেশনা ছিল। মানুষ সেটা মেনে নিয়েছে এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। প্রথম নির্দেশনা ছিল মাস্ক পরা। মানুষ সামান্য হাঁচি হলেই এমনকি এমনিতেই মাস্ক পরে।

এ অভ্যাস তারা করেছিল ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে। এমনিতেই তারা কম-বেশি মাস্ক ব্যবহার করে। তবে কোনোরূপ জ্বর বা হাঁচি হলে তো আর কথাই নেই। জাপানে মাস্ক না পরা রীতিমতো সামাজিক অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে। দ্বিতীয় নিয়ম মানতে বলেছে হাত ধুতে। অবশ্য সদ্য প্রকাশিত ল্যানসেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো বস্তু থেকে করোনা ছড়াচ্ছে না।

তাই হাত ধোয়া কতটা জরুরি সেটা নতুন করে ভাবতে হবে। তৃতীয় হলো ভিড় এড়িয়ে ৩-৬ ফুট দূরত্ব মেনে চলা। এটিও বর্তমানে ভুল প্রমাণ করেছে আমেরিকার সাময়িকী পিএনএস। তাদের ভাষ্যমতে, এর চেয়ে দূরে যেতে পারে এ ভাইরাস। এটি নির্ভর করে বায়ুপ্রবাহ, কতজন একটি বদ্ধ জায়গায় আছে তার ওপর। এছাড়া আমাদের দেশে এ দূরত্ব মেনে চলা রাস্তা, বাজার বা যেকোনো ভিড়ের জায়গায় অসম্ভব।

দক্ষিণ কোরিয়ার পদ্ধতি কী?

তিনটি টি-এর ওপর ভিত্তি করে তারা করোনা মোকাবেলা করেছে। টেস্ট, ট্রেস ও ট্রিটমেন্ট। প্রতিদিন ৬০০-এর অধিক ল্যাবে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করেছে। যারা আক্রান্ত তাদের স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা আলাদা করা হয়েছে। এরপর যাদের অবস্থা খারাপ তাদের ট্রিটমেন্ট দেয়া। এছাড়া এয়ারপোর্টে আসার পর পরীক্ষা করে আলাদা রাখা।

বাংলাদেশ কী করতে পারে?

প্রথম যেটা করা যেত কম খরচে অনেক বেশি টেস্ট করা। কীভাবে? এটা ঠিক যে রিয়েল টাইম পিসিআর পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু এ পদ্ধতিতে সময়, অর্থ ও দক্ষ জনবল লাগে। বর্তমানে আমাদের সক্ষমতা আছে ৩০-৪০ হাজার পরীক্ষা করার। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, অনেকেই পরীক্ষা করাতে পারছে না। ফলে আরো ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

রিয়েল টাইম পিসিআরে সময় বেশি লাগার কারণে আরো বেশি ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হয় এবং ৩৬টি জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হয়। অ্যান্টিজেন কিট অত সেনসিটিভ না হলেও সময় লাগে ১৫-৩০ মিনিট। খরচ হয় ৩০০-৭০০ টাকার মতো। এছাড়া পরীক্ষা করতে অভিজ্ঞ ব্যক্তির প্রয়োজন হয় না। ফলে থানা পর্যায়েও এটি ছড়িয়ে দেয়া যেত।

মাস্ক পরার আইন পাস করাঃ

সরকার ২০ কোটি মানুষকে ৫০ টাকা করে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে সবাইকে মাস্ক বিতরণ করতে পারে। এর পরও কেউ বাইরে মাস্ক ছাড়া এলে তাকে জরিমানা করে মাস্ক দেয়া। এরই মধ্যে আমরা জেনেছি তিন স্তরের কাপড়ের মাস্ক সবচেয়ে ভালো। এ মাস্ক এন-৯৫-এর মতো প্রায় ৯৫ শতাংশ করোনা প্রতিরোধ করে। যদিও রাস্তায় সার্জিকাল মাস্কই বেশি দেখা যায়।

এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় যে লেখা ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ স্লোগান কি সত্যিকার অর্থে মানতে পারি না? আমেরিকান সিডিসির তথ্য মতে, একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ১০-১৫ মিনিট মাস্কবিহীন থাকলেই করোনা ছড়ায়। এছাড়া ল্যানসেটে প্রকাশিত যে করোনা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় না।

ভালো ভেন্টিলেশন হলে কম ছড়াবে। ফলে বুঝতেই পারছি মাস্ক কতটা জরুরি। ফলে পার্টিগুলোতে আরো বেশি ছড়াবে। যেহেতু ভেতরে বেশি ছড়ায়। উপসর্গবিহীন ব্যক্তিরাই ৫৯ ভাগ রোগ ছড়ায়। সুতরাং বাতাস যে প্রধান মাধ্যম তা প্রমাণিত। তবে এটি কোনো গবেষণা না। ফলে পুরোটাই বিশ্বাসযোগ্য না। যেমন বলা হয়েছে পাশাপাশি রুমে হতে পারে, এটির সম্ভাবনা কম। ফলে মাস্কই পারে পূর্ণ মোকাবেলা করতে, যদি সঠিক নিয়মে পরা হয়। এখনো অনেকে জানে না, নাক আর মুখই হলো প্রধান মাধ্যম করোনা শরীরে প্রবেশের।

টিকা নিজেদের বানানোঃ

যেহেতু আমরা জানি না টিকা ঠিক কতদিন কাজ করবে, ফলে নিজেদের দেশে টিকা তৈরি করতে হবে। কারণ সবাইকে টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন মিউট্যান্ট এলেও যাতে আমরা সমস্যায় না পড়ি। উপসংহারে বলব, পরীক্ষা, মাস্ক আর টিকা এই তিনটি হলো বাংলাদেশের জন্য করোনা থেকে মুক্তির উপায়। অন্যগুলো প্রয়োজন, তবে অতটা নয়।

লেখকঃ ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ: চেয়ারম্যান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ ও সহযোগী পরিচালক, জেনোম সেন্টার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ও করোনা মোকাবেলায় চ্যালেঞ্জ ছাড়া আরোও পড়ুন-

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।