ইস্তানবুল ক্যানাল কী এবং কেন

পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং
ইস্তানবুল ক্যানাল কী এবং কেন
বিসিএস + ব্যাংক লিখিত প্রস্তুতি

ইস্তানবুলকে ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন পৃথিবীর রাজধানী। বলাটা কেবল বলার জন্যেই নয়, এর পিছনে রয়েছে এর ইউনিক ভৌগোলিক অবস্থান। এশিয়া আর ইউরোপ জুড়ে এক মাত্র মেগা সিটি এটি। একই সাথে এর ভিতর থেকে বয়ে গিয়েছে বসফরাস প্রনালী।

ইস্তানবুল শহর তাই প্রায় হাজার বছর ধরে ছিল তিনটি পৃথিবী শাসনকারী সাম্রাজ্যের রাজধানী, প্রথমে রোমান এরপর বাইজেন্টাইন এবং সবশেষে অটোমান।

এই গুরুত্বপূর্ণ শহর টিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব আবার নড়ে চড়ে উঠেছে। ১৯২৩ সালে অটোমান খেলাফত বিলুপ্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান আবার বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্ককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ফিরিয়ে এনেছে।

আর ৪ শতাব্দী পূর্বের সুলতান সুলেমানের ইস্তানবুল ক্যানালকে বই এর পাতা থেকে আবার নিয়ে এসেছে প্রজেক্ট আকারে যাকে বলা হচ্ছে এরদোয়ানের ক্রেজি প্রজেক্ট। ১৬ বিলিয়ন ডলারের এই প্রজেক্ট কি কেবলই একটি ক্রেজি প্রজেক্ট? বিশ্ব রাজনীতিতে এই ক্যানালের ভুমিকা টাই বা কী? এটা বুঝতে হলে ইস্তানবুলের ভৌগোলিক অবস্থান, বসফরাস প্রণালীর গুরুত্বের সাথে সাথে বুঝতে হবে মন্ট্রেউ চুক্তি।

বসফরাস এর ভৌগোলিক গুরুত্ব:

বসফরাস প্রণালী একমাত্র প্রণালী যা কৃষ্ণ সাগরকে ভূ-মধ্যসাগর আর এজিয়ান সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। ফলে ইউক্রেন, রোমানিয়া রাশিয়া সহ কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী দেশগুলির ভূ-মধ্যসাগরে বের হবার একমাত্র রাস্তা এটি। একই সাথে মনে রাখতে হবে ইউরোপের সব থেক বড় নদী দানিয়ুব পতিত হয়েছে এই কৃষ্ণ সাগরে।

তাই কেউ যদি জলপথে ইউরোপের বুক চিরে আটলান্টিকে নামতে চায় তাকে কৃষ্ণ সাগর হয়ে দানিয়ুবের তীর এর সব মহা নগরী ছুয়ে তবে নামতে পারবে যেটা বনিকদের একটি স্বপ্ন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মাল কড়ির খেলা:

১৯২৩ সালে অটোমান খেলাফতের পতনের পর লুজান চুক্তি সাক্ষরিত হয় যা বসফরাস প্রণালীকে ডিমিলিটারাইজ করে।

কিন্ত এরপর ইতালীর মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের হুমকির মুখে তুর্কী পুনরায় বসফরাসকে মিলিটারাইজ করে, এই প্রেক্ষাপটে মন্ট্রেউ চুক্তি হয় যার মাধ্যমে বসফরাসকে বেসামরিকরন করা হয়।

সকল বেসামরিক জাহাজ বসফরাস থেকে পার হতে পারবে বিনা বাধায়, কিন্তু কৃষ্ণ সাগর তীরবর্তী দেশের সামরিক জাহাজ কেবল ৯ টি একসাথে পার হতে পারবে, এগুলির সম্মিলিত ওজন ও ১৫০০০ কিলো টনের বেশি হতে পারবে না, আবার ৮ ইঞ্চির বেশি ক্যলিবারের কামান সহ জাহাজও থাকতে পারবে না।

ফলে ওই মুহূর্তে ইতালির হুমকি থেকে বসফরাস রক্ষা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তুর্কী প্যাঁচে পড়ে যায়। কারণ পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে মালিক হয়ে যেটা থেকে প্রতি বছর ৪০ হাজার জাহাজ পার হয়, কিন্তু তুর্কী একটা থেকে ১ ডলার টোল আদায় করতে পারে না।

এদিকে এই চুক্তির কারণে সোভিয়েত এর হয় পোয়া বারো। তার ৯ টা জাহাজ সব সময়ই বসফরাসে বসে থাকে কিন্তু বাইরের দেশের যুদ্ধ জাহাজ তা পৌঁছে না। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীনও জার্মানীর কোন জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করতে পারেনি এই চুক্তির জন্য।

বিশ্ব যুদ্ধের পর এই চুক্তি গলার ফাঁস হয়ে দেখা দেয় যুক্তরষ্ট্রের জন্য। কারণ তাদের বিমানবাহী রণতরী সমস্ত পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ালেও কৃষ্ণ সাগরে যেতে পারছে না। ধীরে ধীরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্ল্যাক সিতে তাদের একছত্র আধিপত্য স্থাপন করে তখন তূর্কী সোভিয়েত এর হাত থেকে বাঁচতে যোগ দেয় ন্যাটোতে।

কিন্তু মন্ট্রেউ চুক্তির বাঁধায় তারপরও লাভ হচ্ছিল না কারণ ৮ ইঞ্চির বড় ক্যালিবারের কামান বাহী জাহাজও যেতে পারে না বসফরাস দিয়ে। এ সময়ে তুরস্ক যুক্তরষ্ট্রের কামান নয়, মিসাইল বাহী ডেস্ট্রয়ারকে ব্ল্যাক সী তে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

সোভিয়েত রে রে করে উঠলে যুক্তি দেয়া হয়, আরে ভাই, এতে তো মিসাইল আছে, ৮ ইঞ্চি কামান তো আর নেই। যুক্তির প্যাঁচে ফেলে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র পা রাখে ব্ল্যাক সি-তে। কিন্তু তাতেও তারা খুশি নয় মোটেও।

এদিকে এশিয়ার উঠতি ড্রাগন চীন আবার স্বপ্ন দেখতে নয়া স্লিক রুটের, সাংহাই থেকে এক ছুটে চলে যাবে ইউরোপের রটারড্রাম। বসফরাস হয়ে দানিয়ুব হয়ে ইউরোর মহানগরী গুলি ছুঁয়ে সহজেই পৌছে যাবে সে পশ্চিম ইউরোপে, তাই তার দৃষ্টিও বসফরাসে।

অন্যদিকে রাশিয়ার ভ্রু দিনকে দিন কুচকে যাচ্ছে, বসফরাস হয়েই তো তার তেল গ্যাসের জাহাজ ভূমধ্য সাগর হয়ে যায় আটলান্টিকে আবার সুয়েজ হয়ে যায় ভারত মহাসাগরে, বসফরাস এড়ানোর তো উপায় নেই কোন।

পৃথিবীর রুটির ভাণ্ডার ইউক্রেন এর শস্যের জাহাজ একমাত্র রুট এই বসফরাস। ইউক্রেনে ফসলহানী হলে মধ্যপ্রাচ্যের সরকার পরে যায়, যেটা হয়েছিল আরব স্প্রিং এ। তাই এদের সবার নজরই বসফরাসের দিকে। কিন্তু মুখ বেজার তুরস্কের। সারা বিশ্ব তাকিয়ে তার চ্যানেলের দিকে কিন্তু তার ট্র্যাকে আসছে না কিছুই।

তাই এর জবাব দিতেই হয়ত সিউডো সুলতান এরদোয়ান প্ল্যান করেছে কৃত্রিম ইস্তানবুল চ্যানেলের যেটা হবে বসফরাস এর একটি বিকল্প রাস্তা। কিন্তু সে রাস্তায় তো আর মন্ত্রেউ চুক্তি নেই।

তাই তুরস্ক আশা করছে এই দফা টোল বাজি করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও হয়ত স্বপ্ন দেখছে , অবশেষে ব্ল্যাক সী তে তার বিমানবাহী রণতরী যাচ্ছে। কিন্তু ভ্রু কুঁচকে গিয়েছে রাশিয়ার পুতিন মহাশয়ের, এমন তো কথা ছিল না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যখন বসফরাস দিয়ে বিনামূল্যে যেতে পারবে তখন টাকা দিয়ে অন্য রাস্তায় কেন যাবে জাহাজ? এখানে তুর্কীরা সম্ভবত একটু আইনী প্যাঁচ হাঁকাবে। এমনিতেই ১৯৩০ সালে যেখানে বসফরাস হতে প্রতি বছর ৩ হাজার জাহাজ পার হত সেখানে এখন ৪০০০০ জাহাজ পার হচ্ছে।

স্ক্রিনিং আর ট্রাফিক মেইন্টেইন করতে প্রণালীর মুখে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে জাহাজগুলিকে। আর স্ক্রিনিং এর ক্ষমতা যেহেতু তুরকীদের হাতেই। তাই কঠোর স্ক্রিনিং শুরু করলে বাধ্য হয়েই হয়ত বিকল্প রাস্তা ধরবে অনেক জাহাজ। এদিকে যদিও ইস্তানবুল নিবাসীদের একটি বড় অংশ ঠিক পছন্দ করছে না এই প্রজেক্ট ।

কারণ পরিবেশ আর সুপেয় পানির উৎস নষ্ট হবার সম্ভাবনা রয়েছে এই প্রজেক্টে কিন্তু একই সাথে এই নতুন ক্যানালের দুই তীরে গড়ে তোলা হবে আধুনিক মেগা সিটি।

ইতিমধ্য কাতার আর ড্রোন জায়ান্ট বায়কার অধিকর্তা যিনি আবার এরদোয়ানের জামাই ও ক্যানালের দুই তীরে ইনভেস্ট করে ফেলছে।

ফলে মনে হচ্ছে রাশিয়ার কুঞ্চিত ভ্রুকে উপেক্ষা করেই চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের লোভাতুর দৃষ্টির সামনেই হয়ত ২০২৩ নাগাদ তৈরি হয়ে যাবে সুয়েজ পানামার মত আর একটি মানব সৃষ্ট মেগা ক্যানাল।

ইস্তানবুল ক্যানাল কী এবং কেন ছাড়া আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।