আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার

47
পেপার ক্লিপিং
Content Protection by DMCA.com

ফোকাস রাইটিং
ভূরাজনীতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার : স্বস্তি, নাকি উদ্বেগ( ২৬ এপ্রিল ২০২১, যুগান্তর)

দীর্ঘ ২০ বছর পর ১ মে থেকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার এ ঘোষণা বিশ্বব্যাপী সব গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মহলেই ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, বিশেষত-মধ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়।

তবে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিভিন্ন পর্যায় থেকে বহুমাত্রিক উদ্বেগ ও আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। শেষোক্তদের মতে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলে তালেবান সেখানে আবার জেঁকে বসবে। আর এসব উদ্বেগ ও আশঙ্কা যারা ব্যক্ত করছেন, তাদের মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য, ইউরোপীয় গবেষক, জাতিসংঘ কর্মকর্তা প্রমুখ অনেকেই রয়েছেন।

এ অবস্থায় উল্লিখিত সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রকাশিত স্বস্তি ও অস্বস্তি উভয় দিক নিয়েই বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই, এশিয়ার এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত থেকেও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলে মনে করি।

আলোচনার শুরুতেই প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তালেবানকে শায়েস্তা ও শেষ পর্যন্ত নির্মূল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান আক্রমণ করলেও ১৯৯২ সালে সোভিয়েত সমর্থিত নজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর থেকে ওই আক্রমণের আগ পর্যন্ত প্রায় এক দশক তালেবান বস্তুত মার্কিন আশীর্বাদেই পুষ্ট হয়েছে।

তন্মধ্যে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে তারা সরাসরি আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ২০০১ সালে আল কায়েদার টুইন টাওয়ার আক্রমণের পর হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের উপলব্ধি হয়, রাশিয়াকে মোকাবিলা করার জন্য তালেবানের পেছনে ব্যয়িত তাদের ‘দুধ-কলা’ কোনো কাজেই আসেনি এবং আকস্মিকভাবেই তারা পক্ষ পরিবর্তন করে তালেবানকে দমনের জন্য আফগানিস্তানে সর্বোচ্চ এক লাখ পর্যন্ত সৈন্য নিয়োগ করে, যার সঙ্গে পরে তার মিত্র দেশগুলোর বাড়তি সৈন্যরাও যুক্ত হয়।

কোনোই সন্দেহ নেই, তালেবান একটি উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের যেসব কাম্য বৈশিষ্ট্য, তার প্রায় কোনোটিই তালেবান ধারণ করে না। ফলে তাদের আদর্শিকভাবে সমর্থন করার কারণ বা যুক্তি কোনোটাই নেই এবং তা না থাকার কথাই যুক্তরাষ্ট্রও ২০০১ সালের পর থেকে বলে আসছে। ২০০১ সালের পর থেকে যা সত্য, এর আগেও নিশ্চয়ই তা অসত্য ছিল না। অথচ রুশ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থেকে আফগানিস্তানের জনগণকে রক্ষার নাম করে সে অসত্য কাজটিই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২-পরবর্তী দশকজুড়ে তালেবানকে পৃষ্ঠপোষকতাদানের মাধ্যমে করে এসেছিল।

অতএব মানতেই হবে, আফগানিস্তান বা তালেবানকে ঘিরে তাদের সে সময়কার উদ্যোগ বা কর্মকাণ্ড মোটেও সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। বরং নিজস্ব স্বার্থপ্রণোদিত ওই অন্যায় কৌশলের আওতায় তারা বহু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত আফগান জনগণকে একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার বোধ, উপলব্ধি ও আন্দোলনকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে।

সত্যি কথা বলতে কী, বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষুদ্রস্বার্থভিত্তিক চলমান বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়া ও চীন সীমান্ত থেকে অদূরবর্তী এ দেশটিতে একটি আত্মশক্তিনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল সরকার না থাকাটা উল্লিখিত সব শক্তিমান পক্ষের জন্যই লাভজনক। কিন্তু তাই বলে প্রথমে সামন্তপ্রভু ও পরে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর যুগযুগান্তরের স্বার্থচর্চার বলি হয়ে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত আফগানিস্তানের ওই সহজসরল মানুষগুলো কি একটি স্বনির্ভর স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার কোনোদিনই ভোগ করতে পারবে না? পৃথিবীর মানুষ কি তবে এতটাই নিষ্ঠুর ও স্বার্থান্ধ?

পশ্চিমা বা পশ্চিম প্রভাবিত বিশ্লেষকরা এখন তথাকথিত শুভার্থীর ভান করে বলছেন যে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলে সেখানে তালেবান আবার জেঁকে বসবে। তাদের সে অভিমতের জবাবে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, একটি দেশের জনগোষ্ঠীর অংশবিশেষের মধ্যে কোনো পশ্চাৎপদ ও অন্যায্য মানসিকতা, প্রবণতা ও আচরণ বিদ্যমান থাকলে সে ক্ষেত্রে সেটি দূরীভূত করে সেখানে একটি অগ্রসর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উপায় কখনোই ভিন্ন দেশ থেকে সৈন্য এনে পাহারা বসানো হতে পারে না।

ভিনদেশি সেনারা চলে যাওয়ার পর তালেবান যদি আবারও আফগান জনগণের ওপর চড়াও হয়ে বসতে চায়, তাহলে তা মোকাবিলার অন্যতম উপায় হচ্ছে সে দেশের জনগণের নিজস্ব ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদারকরণে তাদের সাহায্য করা।

আর দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে, একই প্রক্রিয়ায় তালেবানকেও এ বোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত করা যে, আফগানিস্তানের নাগরিক হিসাবে তারাও নিশ্চয়ই তাদের দেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায়; কিন্তু আমাদের তথাকথিত মুরুব্বিরা কি বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্র সম্পর্ককে সেভাবে দেখতে আগ্রহী? যে বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলে সেখানে তালেবানদের পুনরুত্থান ঘটবে, তারা কি চান যে মার্কিন সৈন্যরাই অনন্তকাল আফগান জনগণকে তালেবানদের হাত থেকে রক্ষা করবে?

আসলে আফগানিস্তানের তালেবান সমস্যার সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো সেখানে তাদের নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল প্রয়োগে যতটা আগ্রহী, দেশটির জনগণের মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপারে ততটাই নির্লিপ্ত বা বলা চলে অনাগ্রহীও। কারণ, তালেবানরা টিকে থাকলে তাদের সমূহ লাভ। নইলে আড়াই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সেখানে যত অর্থ (অন্তত ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয় করেছে, তার সিকি ভাগও যদি তারা তালেবানসহ আফগান জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করত, তাহলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারায় আফগানিস্তানের পক্ষে আজ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।

সেক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া ও এর কোলঘেষে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির যে সুযোগ আফগানিস্তানের রয়েছে, যা এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের অতটা নেই, সেটি একটি বাড়তি সুবিধা হিসাবে গণ্য হতে পারত।

আফগানিস্তানের রয়েছে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা, তালেবান সংঘাত সংক্রান্ত আলোচনার ভিড়ে যা এতকাল প্রায় কখনোই সামনে আসেনি। তাছাড়া এটি এশিয়ার অন্যতম ফল ও কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারক দেশ হিসাবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনারও দাবি রাখে। রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের রহমত যে কিশমিশ, খোবানি, বাদাম ও অন্যান্য জনপ্রিয় ফল বেচতে ভারতবর্ষে এসেছিল, সেটি শুধু একটি গল্পের বর্ণনা মাত্র নয়-ভূ-অর্থনীতির একটি তথ্যচিত্রও।

১২৯৯ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের আঁকা সে চিত্র সোয়া শ বছর পর এখন আরও বেশি সম্ভাবনাময়। আফগানিস্তানের যুবারা এখন ক্রিকেট, ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধুলায় বিশ্ব-আঙিনায় ক্রমেই দাপুটে ও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ধারণা করা চলে, মার্কিন সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পেলে অচিরেই তারা দক্ষিণ এশিয়ার তো বটেই, পুরো এশিয়ারই অন্যতম বিকাশমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।

তবে সতর্কতা হিসাবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের শেষ সময়সীমা হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর। ফলে ১ মে থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পরও যদি নতুন কোনো কূটচিন্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে সেনা প্রত্যাহার স্থগিত করে দেয়, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে তেমনটি না ঘটুক-সেটাই প্রত্যাশা।

আবু তাহের খান : পরিচালক, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ছাড়াও আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। আমাদের সাইট থেকে কপি হয়না তাই পোস্টটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here