আফগানিস্তান ছাড়ছে আমেরিকা, অথচ উৎসব নেই কোথাও

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী
Content Protection by DMCA.com

আফগানিস্তান ছাড়ছে আমেরিকা, অথচ উৎসব নেই কোথাও

২০ বছর পর আফগানিস্তান ছাড়তে চাইছে আমেরিকা। সেপ্টেম্বর থেকে তাদের জওয়ানরা ওখানে থাকবে না। এই ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া হয়েছে বিস্ময়কর। কোনো উৎসব নেই কোথাও। বরং আমেরিকার ফিরে যাওয়ায় সবাই উদ্বিগ্ন। দেশবাসী এবং প্রতিবেশীদের ভয় তাড়াতে কোনো ভরসা দিতে পারছে না তালেবান নেতারা। এই যুদ্ধে তালেবান জিতেছে—কিন্তু শান্তিকে বিজয়ী দেখা যাচ্ছে না। কাবুলে গাড়িবোমা এবং আত্মঘাতী হামলা ইদানীং বেশ বেড়ে গেছে।

ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানের দায় নিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র:

ন্যাটোর অন্যান্য দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য আছে এখন আফগানিস্তানে। ট্রাম্পের আমলে ঘোষণা ছিল ১ মে এরা চলে যাবে। বাইডেন সেটা সেপ্টেম্বরে টেনে নিয়েছেন। হয়তো দেশটির বিবদমান পক্ষগুলোকে সমঝোতার জন্য আরও সময় দিলেন তিনি এর মাধ্যমে। সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার দায় নিতে অনিচ্ছুক।

বাইডেনের ঘোষণায় তাদের চলে যাওয়ার পর দেশটি কীভাবে চলবে, তার রোডম্যাপ নেই। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও ভারত মিলে আফগানিস্তানের দায়িত্ব নিক। তুরস্ককেও রাখতে চায় তারা। তালেবানের তাতে আগ্রহ নেই। তুরস্কে ভবিষ্যতের আফগানিস্তান নিয়ে সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল এ সপ্তাহে। তালেবানের অসহযোগিতায় সেটা বাতিল হয়েছে। রাশিয়ায় গত মার্চে একই উদ্দেশ্যে সম্মেলন বসেছিল। তাতেও কোনো আশাবাদী ফল আসেনি।

পুরোনো শাসনের আদলে ফিরতে চায় তালেবান:

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় তালেবান খুশি। এই খুশির ন্যায্য কারণ রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর সামরিক শক্তিকে প্রায় খালি হাতে ফেরত পাঠাচ্ছে তারা। মাতৃভূমি রক্ষায় তারা সফল। পাশাপাশি হারানো দাপট ফিরে পাওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সমরবিদেরা আবারও জানল কেবল উন্নত প্রযুক্তি আর বড় বাহিনী যুদ্ধজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্র হেরেছিল স্রেফ এক আদর্শের কাছে। আফগানিস্তানে জিততে পারল না স্থানীয় গোত্রবাদী এক সমাজ ব্যবস্থার কারণে।

তালেবান ওই সমাজ ব্যবস্থারই প্রতীকী ছবি। আমেরিকার সৈন্যরা চলে গেলে আগের শাসনামলের চরিত্রে ফিরতে চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তালেবান। তাদের বাসনা একক কর্তৃত্ব। সমঝোতা করে দেশ চালাতে অনিচ্ছুক তারা, বরং সেপ্টেম্বরের পর পুরো কর্তৃত্ব চায়। কিন্তু তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে দেশের ২০ থেকে ৩০ ভাগ জেলা। সরকারি বাহিনীর হাতেও অনুরূপ। বাকি ৫০ ভাগ এলাকা রাতে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে থাকে—দিনে সরকারি বাহিনীর।

এ রকম পরিস্থিতিতে দেশটিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে ভীতি এবং দেশের প্রতিবেশীদের মাঝে বাড়ছে শঙ্কা। অতীত ধাঁচের তালেবানের শাসন মানেই সশস্ত্রতা, খুন, গৃহযুদ্ধ। বিশ্বের হরেক সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল তখন দেশটি। এ রকম অবস্থা যেকোনো অঞ্চলের জন্যই বোঝা এবং বিপজ্জনক। সবচেয়ে ভয়ে রয়েছে দেশটির নারী সমাজ ও সংবাদমাধ্যম। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছে। এসব আগের মতোই অব্যাহত থাকলে তাকে পুঁজি করে সৈন্যদের বড় অংশ দেশে পাঠিয়েও আমেরিকা যে ছোটখাটো একটা উপস্থিতি আফগানিস্তানে রাখবে, তা অনুমান করা যায় এখনই।

অস্ত্র তুলে নেওয়া যত সহজ—ততই কঠিন অস্ত্র নামানো:

দুই দশকের যুদ্ধে আফগানরা অবশ্যই ক্লান্ত। কিন্তু আগ্রাসী ন্যাটো চলে যাওয়ার পরও দেশটিতে যে শান্তি আসবে তেমন আলামত নেই। বাইডেনের এত বড় সংবাদে কোথাও উৎসব নেই। মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাংবাদিকদের শঙ্কা—যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ামাত্র অনেক এলাকা ‘আইএস’-এর দখলে চলে যেতে পারে। ইরাক ও সিরিয়ায় একসময় যা ঘটেছিল। তাতে তালেবানের সঙ্গে তাদের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পাশাপাশি কাবুলসহ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায়ও গৃহযুদ্ধের আগুন লাগবে।

আইএস ছাড়াও দেশটিতে আরও অন্তত দুটি সশস্ত্র পক্ষ আছে। একটা হলো হাজারা সমাজ এবং অন্যদিকে আছে উজবেক ও তাজিকরা। পশতু সুন্নি তালেবানের সঙ্গে শিয়া হাজারাদের রয়েছে ঐতিহাসিক নানান মতভিন্নতা। উজবেক ও তাজিকদের সঙ্গেও তালেবানের মানিয়ে চলার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আফগানিস্তান ১৪টি জাতি এবং ৩০টি ভাষার দেশ হলেও পশতু তালেবান যদি আগের মতো বন্দুকের ভাষায় একাধিপত্য করতে চায়, তাতে শান্তি অধরা থাকবে। দেশজুড়ে সবাই বুঝতে পারছে—জাতির প্রয়োজনে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া যত সহজ, ততই কঠিন অস্ত্র নামানো।

প্রতিবেশী দেশগুলো শঙ্কায় পড়েছে:
আফগানিস্তানের সঙ্গে ছয়টি দেশের সীমান্ত রয়েছে। বাইডেনের ঘোষণা এ রকম সব দেশকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানকে। ন্যাটো চলে যাওয়ার পর যদি দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধে, তাহলে বেশি দোষের ভাগীদার হবে পাকিস্তান। বিপদেও পড়বে তারা বেশি। তালেবান মূলত রাওয়ালপিণ্ডির সহায়তায় এত দূর এসেছে। কাবুলে তালেবান আধিপত্য আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারে পাকিস্তানকে এগিয়ে রাখবে।

কিন্তু তালেবান যদি দেশে শান্তি আনতে না পারে, সেই দায় বিশ্ব সমাজ পাকিস্তানের ওপরই ফেলবে। আফগানিস্তান নতুন করে অশান্ত হলে পাকিস্তানে শরণার্থী ঢেউ আরেক দফা বাড়তে পারে। আবার তালেবান যদি বন্দুকের শান্তি কায়েম করতে পারে—সেটা পাকিস্তানের স্থানীয় তালেবানকে উৎসাহিত করবে সশস্ত্রতায়।

ইরানের জন্য বিপদ ভিন্নতর। শিয়া হাজারা জনগোষ্ঠীকে রক্ষার দায় আছে তাদের। তালেবান না মারলেও আইএসের হামলার শিকার হচ্ছে হাজারা জনগোষ্ঠী। ইরান এদের বিপুলভাবে সশস্ত্র করেছে ইতিমধ্যে। আপাতত সেটা আত্মরক্ষামূলক হলেও তালেবান আক্রমণাত্মক হলে হাজারা তরুণেরা সশস্ত্র উত্তর দিতে তৎপর হবে।

পাকিস্তান ও ইরানের বাইরে মধ্য এশিয়ার তিনটি দেশ উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানের আতঙ্ক হলো তালেবানের সঙ্গে উজবেক ও তাজিকদের সম্পর্ক নিয়ে। কয়েক দিন আগে মস্কো সম্মেলনে উজবেক জেনারেল রশীদ দোস্তামের সঙ্গে তালেবান সেনাপতি মোল্লা ফাজেলের যেভাবে প্রকাশ্য কথা–কাটাকাটি হয়েছে, তাতে বোঝা গেছে পুরোনো বিভেদের জের বইছে এখনো।

রাশিয়া ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা ২০ বছর আগের তালেবান মডেলের কাবুল চাইছে না। চীনও একই ধাঁচের আফগানিস্তান নিয়ে ভয়ে আছে। তাতে উইঘুর স্বাধীনতাকামীদের জন্য আফগানিস্তানের মাটি ভালো আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া-চীনের মতো ভারতের ভয় তালেবাননিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান কাশ্মীরে সশস্ত্র জনবল বাড়াতে পারে।

তবে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তার উত্তাপ যে কেবল এই ৪-৫ প্রতিবেশীর গায়ে লাগবে তা নয়। সিরিয়ার প্রতিবেশী সংখ্যা পাঁচ। কিন্তু কয়েক ডজন দেশকে সে দেশের শরণার্থীদের বোঝা বইতে হচ্ছে এখন। আফগানিস্তান থেকেও একই দৃশ্যের অবতারণা হতে পারে আবার।

তালেবান ভবিষ্যৎ শাসনের স্পষ্ট ছবি তুলে ধরতে পারছে না:

স্বদেশের মানুষ কিংবা বিদেশি প্রতিবেশীদের উদ্বেগ নিয়ে তালেবান আপাতত ভাবিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার পর তারা কীভাবে দেশের শাসনে যুক্ত হতে চায় এবং সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারা কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, এসব বিষয়ে তালেবান কোনো স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে না। কেবল নিজস্ব মডেলের ‘ইসলামি শাসন’ প্রতিষ্ঠার কথাই জানাচ্ছে তারা। এ রকম শাসন পদ্ধতির অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

নারী শিক্ষা বিষয়ে তাদের পুরোনো অবস্থান নিয়ে আফগানিস্তানে ব্যাপক সমালোচনা আছে। রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি তাদের সশস্ত্র অসহিষ্ণুতাও যথেষ্ট ভীতির কারণ হয়ে আছে। ক্ষমতা পেলে আবারও তারা পুরোনো পদ্ধতিই কায়েম করবে কি না, এসব বিষয়ে শিগগিরই স্পষ্ট ঘোষণা না এলে তালেবানবিরোধী শক্তিসমূহ এক জোট হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে চাইবে। যদিও তালেবানের সামনে দাঁড়ানোর মতো তাদের শক্তিশালী সামরিক কোনো ভিত্তি নেই।

আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের নিয়ন্ত্রণে যে বাহিনী রয়েছে, তারা তালেবানের মোকাবিলায় যথেষ্ট শক্তিশালী না হলেও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তাদের হাতে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। তালেবান সরকার গঠন করলে এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাও মহাচিন্তার বিষয়।

অনেক দেশ ছায়াযুদ্ধে নামতে পারে আফগান মাটিতে:

২০ বছর আফগানরা যুদ্ধ বন্ধের অপেক্ষায় ছিল। আগামী অক্টোবরেই তাদের সে অবস্থায় ঠেলে দিতে চাইছে আমেরিকা। প্রশ্ন উঠেছে, এরপর কী হবে? বর্তমান সরকার যে বর্তমান আদলে থাকবে না, সেটা নিশ্চিত। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপ কী হবে? দেশটিতে বহু জাতি এবং বহু সশস্ত্র পক্ষ রয়েছে। ক্ষমতার টেকসই স্থায়ী হিস্যা চাইছে সবাই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ঘানি বলছেন, তালেবান এলে তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তালেবান চাইছে সবকিছুর আগে ২০০১-এর মতো একচেটিয়া ক্ষমতা। আগামী চার মাসের মধ্যে এই দূরত্বের ফয়সালা করতে হবে। সেটা করা না গেলে ন্যাটোর সৈন্যরা কাবুল ছাড়া মাত্রই পারস্পরিক হানাহানি অনিবার্য।

তালেবানের দ্বারা নিয়ন্ত্রণঅযোগ্য বাড়তি কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে ভারত-পাকিস্তান ছায়াযুদ্ধ। আফগান মাটিতে পরস্পরের বন্ধুদের নাজেহাল করতে চাইবে সৌদি আরব ও ইরানও।

এ রকম সব পক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো কোনো একক শক্তি নেই আপাতত আফগানিস্তানে। সে ক্ষেত্রে আমেরিকা কি আদৌ যেতে পারবে? বাইডেনের ঘোষণার আগে কি এ রকম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবেনি যুক্তরাষ্ট্র? সৈন্য প্রত্যাহারের চলতি ঘোষণা কি তবে কূটনীতিক পাশা খেলারই একাংশ মাত্র?

আপাতত এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই। সাধারণ আফগানরা তাই আশাবাদী নয়। আফগানিস্তানে সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি কায়েম সম্ভব, এটা বিশ্বাস করার মানুষ দেশটিতে এবং দেশের বাইরে বিরল। এমনকি অনেকের সন্দেহ—আমেরিকা এত তাড়াতাড়ি যেতে পারবে না এখান থেকে।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ

ফেইসবুকে আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল পেইজ ও অফিসিয়াল গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকুন। ইউটিউবে পড়াশুনার ভিডিও পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।